মেঘের ওপারে হৈমী

এক পাহাড়ি কন্যার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস

এই উপন্যাস সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এখানে বর্ণিত কোনো ব্যক্তি, পরিবার, স্থান বা ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল থাকলে তা নিছক কাকতালীয়। পাহাড়ি জীবনের আবেগ, সম্পর্ক, স্বপ্ন, বেদনা ও সংগ্রামের যে চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে, তা এক পাহাড়ি নারীর জীবনযাত্রার মানবিক অভিজ্ঞতার প্রতীকী রূপ মাত্র।

লেখক: তারিক ওবায়দা

proggyarbatighor.com

সূচিপত্র প্রথম পর্ব : জুমের ধোঁয়া আর শিশিরভেজা সকাল
দ্বিতীয় পর্ব: হোস্টেলের ঘণ্টা আর গ্রাম ছাড়া প্রথম রাত
তৃতীয় পর্ব: কৈশোরের দোরগোড়ায়
চতুর্থ পর্ব : কুয়াশার ভিড়ে
পঞ্চম পর্ব: বিদায়ের সকাল
ষষ্ঠ পর্ব : প্রথম কথার সুর
সপ্তম পর্ব : সম্পর্কের গভীরতা
অষ্টম পর্ব: নিঃশব্দে ঝরা পাতা
নবম পর্ব: শহরের আকাশ, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন
দশম পর্ব: নীরবতার মূল্য
একাদশ পর্ব: শূন্যতার মধ্যে বেঁচে থাকা
দ্বাদশ পর্ব : ফিরে আসার ডাক
ত্রয়োদশ পর্ব : ছবির বাইরে যে মুখ
চতুর্দশ পর্ব: শিকড়ের কথা
পঞ্চদশ পর্ব : ফেরার আগে
ষোড়শ পর্ব : শিকড়ের পথে
সপ্তদশ পর্ব : ফিরে আসার আলো
অষ্টাদশ পর্ব : নিজের আকাশের নিচে

প্রথম পর্ব : জুমের ধোঁয়া আর শিশিরভেজা সকাল

পাহাড়ের ভোরের একটা আলাদা গন্ধ আছে। সেই গন্ধ কোনো সুগন্ধির বোতলে বন্দি করা যায় না। ভেজা মাটি, বাঁশপাতায় জমে থাকা শিশির, দূরের ঝিরির কলকল শব্দ আর সদ্য পোড়ানো জুমের ধোঁয়া—সব মিলিয়ে এমন এক ঘ্রাণ, যা একবার বুকভরে নিলে সারাজীবন ভুলে থাকা যায় না।

ভোরের আলো পাহাড়ের বুক বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলে আজও হৈমন্তীর মনে হয়—মানুষ যত দূরেই চলে যাক, তার ভেতরে একটা ছোট্ট গ্রাম চিরকাল বেঁচে থাকে।

সেই গ্রামের নাম দেবাছড়া পাড়া।

থানচির গভীর পাহাড়ে, মেঘ আর বনভূমির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটি ত্রিপুরা পাড়া। সেখানে জন্মেছিল খ্রিস্টান ত্রিপুরা পরিবারের বড় মেয়ে হৈমন্তী ত্রিপুরা। তবে পুরো পাড়ায় কেউ তাকে এই নামে ডাকত না। সবার মুখে একটাই নাম—হৈমী।

তার বাবা জরামণি ত্রিপুরা ছিলেন জুমচাষি। মা সুবর্ণা ত্রিপুরা সংসারের পাশাপাশি জুমের কাজেও সমান কাঁধ মিলিয়ে চলতেন। দুই ছেলে, চার মেয়ের বড় সন্তান হওয়ায় খুব ছোটবেলাতেই হৈমী বুঝে গিয়েছিল—সংসারের বড় মেয়ে হওয়া মানে শুধু আদর পাওয়া নয়, দায়িত্বও বহন করা।

ভোরের আলো ফোটার আগেই জরামণি ঘুম থেকে উঠতেন। কাঁধে দা, হাতে বাঁশের ঝুড়ি। রান্নাঘরের মাটির চুলায় আগুন জ্বালাতেন সুবর্ণা। ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যেত সেদ্ধ ভাতের গন্ধ।

“হৈমী, ওঠ মা। আজ জুমে অনেক কাজ।”

মায়ের ডাকে চোখ মেলে উঠত সে। অন্য বাচ্চারা হয়তো তখনও মায়ের আঁচল জড়িয়ে ঘুমোত, কিন্তু হৈমীর সকাল শুরু হতো পাহাড়ের পথে হাঁটা দিয়ে।

পাহাড়ি মানুষের কাছে জুমচাষ শুধু চাষাবাদ নয়; এটি জীবন, ঐতিহ্য, পরিশ্রম আর বিশ্বাসের আরেক নাম। পাহাড় পরিষ্কার করা, শুকনো ডালপালা পুড়িয়ে জমি প্রস্তুত করা, প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষা, তারপর একসঙ্গে ধান, ভুট্টা, আদা, হলুদ, মরিচ, কুমড়ো, তিল আর নানা সবজির বীজ ছড়িয়ে দেওয়া—প্রতিটি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো পরিবারের ঘাম।

হৈমীর ছোট্ট হাতে কখনো ভারী দা তুলে দেওয়া হতো না। সে আগাছা পরিষ্কার করত, শুকনো ডাল কুড়িয়ে আনত, পানির কলস বয়ে দিত, কখনো ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করত।

একদিন হাঁটতে হাঁটতে সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল,

— “বাবা, পাহাড় এত উঁচু কেন?”

জরামণি হেসে বলেছিলেন,

— “যেন মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখে।”

কথাটার অর্থ সে তখন বুঝতে পারেনি। বহু বছর পরে শহরের কংক্রিটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সেই কথাই বারবার মনে পড়েছিল।

দুপুরে সবাই একসঙ্গে বসে খেত। কলাপাতার ওপর ধোঁয়া ওঠা জুমের চালের ভাত, পাহাড়ি শাক, বাঁশকোরল, কচুশাক, কখনো শুঁটকি, কখনো নাপ্পি, সঙ্গে কাঁচামরিচ। খাবার ছিল অল্প, কিন্তু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ ছিল অফুরন্ত।

দারিদ্র্য ছিল, অভাব ছিল, কিন্তু কেউ একা খেত না।

বর্ষা নামলেই পাহাড়ের রূপ বদলে যেত। ঝিরি ফুলে উঠত, ছড়াগুলো গর্জে উঠত, চারদিকে মেঘ আর বৃষ্টির শব্দে পৃথিবী যেন অন্য রকম হয়ে যেত। সেই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকত ভয়।

এক বর্ষার গভীর রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। মেঘের গর্জনে পুরো পাহাড় কেঁপে উঠছিল। হঠাৎ বাইরে চিৎকার—

“হড়কা বান! সবাই বের হও!”

ঘুম ভেঙে সবাই দৌড়ে বেরিয়ে আসে। ছোট্ট ঝিরিটা মুহূর্তেই উন্মত্ত স্রোতে পরিণত হয়েছে। কারও মুরগির ঘর ভেসে গেল, কারও জুমের বীজ নষ্ট হয়ে গেল।

পাশের বাড়ির বৃদ্ধা দুই হাত তুলে প্রার্থনা করছিলেন,

“হে প্রভু, আমাদের রক্ষা করো।”

হৈমী ভয়ে বাবার হাত শক্ত করে ধরে ছিল।

জরামণি তার মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন,

“ভয় পাবি না মা। পাহাড় আমাদের কষ্টও দেয়, আবার ফসলও দেয়। ঈশ্বর আমাদের দেখছেন।”

সেদিন প্রথমবার হৈমী বুঝেছিল—প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি ভীষণ শক্তিশালী।

কিন্তু পাহাড়ের জীবন শুধু সংগ্রামের ছিল না।

ডিসেম্বর এলেই দেবাছড়া পাড়া যেন নতুন রূপ নিত। বাঁশ দিয়ে সাজানো হতো ছোট্ট গির্জা। যার নতুন পোশাক নেই, সেও পরিষ্কার জামা পরে আসত। সন্ধ্যায় মোমবাতির আলো, প্রার্থনার সুর, শিশুদের ক্যারল গান আর সবার মুখের হাসিতে পাহাড় ভরে উঠত।

বড়দিন ছিল হৈমীর বছরের সবচেয়ে প্রিয় দিন।

দূরের আত্মীয়রা আসত। মামা, খালা, মামাতো ভাইবোনেরা মিলে উঠোন মুখর হয়ে থাকত। কেউ ঝিরিতে মাছ ধরত, কেউ বুনো ফুল তুলত, কেউ বাঁশের দোলনায় দুলত। সন্ধ্যায় আগুন জ্বেলে গল্প হতো গভীর রাত পর্যন্ত।

হৈমী আকাশের দিকে তাকিয়ে মাকে একদিন বলেছিল,

— “মা, এত তারা কি শুধু আমাদের পাহাড়েই দেখা যায়?”

সুবর্ণা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,

— “তারা সব জায়গাতেই আছে মা। শুধু শহরের মানুষ ব্যস্ত বলে দেখতে পায় না।”

সেই উত্তরটা অনেক বছর পর ঢাকার আকাশের দিকে তাকিয়ে সত্যি মনে হয়েছিল।

গ্রামের ছোট্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিনটা ছিল জরামণির জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন। নিজের বেশি দূর পড়াশুনা করতে না পারলেও তিনি মেয়ের হাতে নতুন খাতা তুলে দিয়ে বলেছিলেন,

“তুই পড়বি। তোর ভাইবোনেরাও পড়বে। আমাদের জীবন যদি না বদলায়, তোর জীবন বদলাবে।”

নয় বছর বয়সী হৈমী সেদিন পুরো কথার অর্থ বুঝতে পারেনি। কিন্তু বাবার চোখে যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটাই তার নিজের স্বপ্ন হয়ে গেল।

পড়াশোনায় সে ভালো ছিল। শিক্ষকরা তাকে খুব স্নেহ করতেন। অল্প বয়সেই তার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করল—পাহাড়ের ওপারে পৃথিবীটা কেমন?

ক্লাস ফোরে ওঠার পর সিদ্ধান্ত হলো, তাকে পাহাড়ের একটি মিশনারি বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করানো হবে।

খবরটা শুনে সবাই খুশি হলো।

শুধু হৈমীর বুকটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।

বাড়ি ছেড়ে সে কোনোদিন এক রাতও কোথাও থাকেনি।

ভর্তির আগের সন্ধ্যায় মা তার জন্য একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন। দুই জোড়া জামা, একটি পুরোনো সোয়েটার, একটি অ্যালুমিনিয়ামের থালা, একটি মগ, একটি বাইবেল, আর নিজের হাতে বোনা ছোট্ট একটি গামছা।

ব্যাগ গুছাতে গুছাতে সুবর্ণা চুপচাপ ছিলেন।

হৈমী ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

— “মা… আমি গেলে তুমি কাঁদবে?”

সুবর্ণা মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— “মায়েরা কাঁদে না রে… তারা শুধু অপেক্ষা করতে শেখে।”

পরদিন ভোরে কুয়াশায় মোড়া পাহাড়ি পথ ধরে তারা রওনা দিল।

সামনে হাঁটছেন জরামণি, কাঁধে মেয়ের ব্যাগ।

মাঝখানে হৈমী।

পেছনে সুবর্ণা।

পাহাড়ি পথ শেষ হয়ে যখন কাঁচা রাস্তা শুরু হলো, হৈমী একবার পেছনে তাকাল।

কুয়াশার ভেতর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দেবাছড়া পাড়া।

তার ছোট্ট বুকের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত কষ্ট জমে উঠল।

সে তখনও জানত না, এই পথ শুধু তাকে একটি স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে না। এই পথ তাকে এমন এক জীবনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষ, সম্পর্ক, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর ফিরে পাওয়া শিকড়—সবকিছুর নতুন অর্থ একদিন সে নিজেই খুঁজে পাবে।

সেদিন সে শুধু মনে মনে একটি প্রার্থনা করেছিল—

“হে প্রভু, পরের বড়দিনে যেন আমি আবার আমার পাহাড়ে ফিরতে পারি।”

সে জানত না, মানুষের জীবনে কিছু ফেরা হয় কয়েক মাস পরে, আর কিছু ফেরা হতে লেগে যায় পুরো একটি জীবন।

দ্বিতীয় পর্ব: হোস্টেলের ঘণ্টা আর গ্রাম ছাড়া প্রথম রাত

দেবাছড়া পাড়ার কুয়াশা ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে বাবা, মা আর নয় বছরের হৈমী এগিয়ে চলেছে। কাঁধে ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ, হাতে মায়ের আঙুল। জীবনে প্রথমবার সে বুঝতে পারছিল, পরিচিত পৃথিবীরও একদিন শেষ সীমানায় এসে দাঁড়াতে হয়।

বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছিল, পাখিরা ডাকছিল আগের মতোই। তবু হৈমীর মনে হচ্ছিল, চারপাশের সবকিছু যেন আজ তাকে বিদায় জানাচ্ছে।

কিছু দূর হেঁটে তারা পৌঁছাল পাহাড়ি সড়কে। সেখান থেকে একটি পাহাড়ি জিপে করে যেতে হবে মিশনারি স্কুলে। জিপে ওঠার আগে সুবর্ণা মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে শুধু বললেন,

— “কষ্ট হলে আগে প্রার্থনা করবি।”

হৈমী মাথা নাড়ল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।

দুই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছাল সেন্ট মেরিস হিল মিশন স্কুলে। উঁচু পাহাড়ের ঢালে লাল ছাদের ভবন, পাশে ছোট্ট গির্জা, দূরে ছাত্রীনিবাস আর ফুলে ভরা বাগান। চারপাশে পাইন-সেগুনের গন্ধ মিশে ছিল বাতাসে। এত বড় জায়গা হৈমী আগে কখনো দেখেনি।

হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা সিস্টার হেসে জিজ্ঞেস করলেন সে হৈমন্তী কি না। জরামণি জানালেন, সবাই তাকে হৈমী নামেই ডাকে। সিস্টার মৃদু হেসে বললেন, “তাহলে আমরাও হৈমী বলেই ডাকব।

তাকে দেখানো হলো একটা কাঠের খাট, পাতলা গদি, ভাঁজ করা কম্বল, পাশে একটা লোহার আলমারি। এটাই এখন তার নতুন ঠিকানা।

মা ব্যাগ খুলে কাপড়গুলো গুছিয়ে দিলেন, বাইবেলটা আলমারির ওপর রাখলেন। কেউ কিছু বলছিল না। বিদায়ের কথাটা যেন কারও মুখেই আসতে চাইছিল না।

শেষে সিস্টারই বললেন যেতে হবে, নাহলে বিকেলের আগে পথ খারাপ হয়ে যাবে। কথাটা শুনেই হৈমী মায়ের হাত খামচে ধরল।

— “মা… আমি কি তোমাদের সঙ্গে যেতে পারি?”

সুবর্ণা চোখ লুকিয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।

— “আর কয়টা দিন, তারপর তো বড়দিনে বাড়ি আসবি।”

বাবা কিছু বললেন না, শুধু মেয়ের মাথায় হাত রেখে চুপচাপ প্রার্থনা করলেন। তারপর দুজনের অবয়ব ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল পাহাড়ি পথে। সেদিন প্রথমবার হৈমীর মনে হলো, একাকীত্বেরও একটা শব্দ আছে — আর সেই শব্দ ভীষণ নিঃশব্দ।

প্রথম রাতটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। সন্ধ্যা ছয়টায় ঘণ্টা বাজল, সবাই গির্জায় গেল, তারপর খাওয়া, পড়া, আর রাত নয়টায় বাতি নেভা। হোস্টেলের রুটিন ছিল কড়া অথচ শৃঙ্খলাবদ্ধ — ভোরের ঘণ্টা, প্রার্থনা, নাশতা, স্কুল, বিকেলের খেলা, সন্ধ্যার প্রার্থনা, তারপর ঘুম।

প্রথম কয়েক সপ্তাহ হৈমী প্রায় রাতেই কম্বলের ভেতর মুখ লুকিয়ে কাঁদত, যেন কেউ টের না পায়। ভাবত, মা এখন রান্নাঘরে আছেন কি না, বাবা জুম থেকে ফিরেছেন কি না, ছোট ভাইটা তাকে খুঁজছে কি না।

এক রাতে পাশের খাট থেকে ফিসফিস শোনা গেল,

— “তুমিও বাড়ির জন্য কাঁদো?”

মেয়েটির নাম লিজা, মারমা সম্প্রদায়ের। হৈমী মাথা নাড়তেই লিজা মৃদু হাসল,

— “আমিও কাঁদি। কাউকে বলো না শুধু।”

সেই রাত থেকেই শুরু দুজনের বন্ধুত্ব। দুই অচেনা মেয়ে, দুই ভিন্ন পাহাড় থেকে আসা, কিন্তু রাতের অন্ধকারে একই রকম মন খারাপ নিয়ে জেগে থাকা — এই মিলটাই তাদের কাছাকাছি নিয়ে এল। এরপর থেকে প্রতিটা রাতেই বাতি নেভার পর ফিসফিস কথা হতো দুজনার মধ্যে, কখনো বাড়ির গল্প, কখনো শুধুই বোকা বোকা হাসাহাসি।

ধীরে ধীরে হৈমীর পৃথিবী বড় হতে লাগল। এখানে শুধু ত্রিপুরা নয়, মারমা, খুমি, ম্রো, বম — বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মেয়েরা একসাথে থাকত, পড়ত। ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা, খাবার আলাদা, কিন্তু বাড়ির জন্য মনখারাপটা ছিল সবার এক। এই হোস্টেলেই প্রথম সে বুঝেছিল, পাহাড় শুধু তার গ্রামের নাম নয় — পাহাড় আসলে অনেক মানুষের এক মিলিত পরিচয়।

শিক্ষকরা ছিলেন কঠোর, কিন্তু স্নেহশীল। ভুল করলে শাসন, ভালো করলে মন খুলে প্রশংসা। হৈমী পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় দ্রুতই তাদের নজরে পড়ে গেল, বিশেষ করে বাংলা বই পড়ায়। লাইব্রেরির ছোট্ট এক তাকে সাজানো গল্পের বই যেদিন প্রথম হাতে নিল, তার মনে হয়েছিল — মানুষ শুধু পাহাড় পেরিয়েই নয়, বই পড়েও অনেক দূরে যেতে পারে।

তবু রাত নামলেই বুকের ভেতর সেই পুরনো হাহাকার ফিরে আসত। বড়দিনের অপেক্ষা যেন শেষই হতে চাইছিল না।

অবশেষে ডিসেম্বর এল। হোস্টেল জুড়ে সাজসজ্জা শুরু হলো, ক্যারল গানের মহড়া, কাগজের তারা, গির্জায় নতুন ফুল। হৈমীর মনও আলোয় ভরে উঠতে লাগল — কারণ সে জানত, আর কটা দিন পরেই বাড়ি ফেরা।

বড়দিনের আগের দিন বাবা এলেন তাকে নিতে। দূর থেকে দেখেই হৈমী দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। জরামণি শুধু বললেন,

— “দেখি তো… আমার মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে।”

ফেরার পথটা আসার পথের মতো ছিল না। প্রতিটা পাহাড়, প্রতিটা ঝিরি, প্রতিটা বাঁশঝাড় যেন নতুন চোখে দেখছিল সে। মনে হচ্ছিল, এত অল্প সময়ে সে কত কী মিস করে ফেলেছে।

দেবাছড়া পাড়ায় পৌঁছাতেই ভাইবোনেরা দৌড়ে এসে ঘিরে ধরল তাকে। মা দরজায় দাঁড়িয়ে, চোখে সেই একই অপেক্ষা।

সেই রাতে সবাই একসাথে বসে খেল। হৈমী গল্প করল হোস্টেলের ঘণ্টা, নতুন বন্ধু লিজা, লাইব্রেরি, সিস্টারদের কথা। মা চুপচাপ শুনলেন। বাবা শুধু একবার বললেন,

— “তুই মানুষ হবি, মা।”

সেই রাতে নিজের বাঁশের ঘরে, নিজের বিছানায় শুয়ে হৈমী অনেক দিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

সে তখনও জানত না, সামনে অপেক্ষা করছে তার কৈশোর। আর সেই কৈশোরেই একদিন এমন একজন মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হবে, যার উপস্থিতি তার জীবনকে বদলে দেবে। সেই পথেই একদিন সে প্রথম হৃদয়ের ভাষা শিখবে।

তৃতীয় পর্ব: কৈশোরের দোরগোড়ায়

শীত নামলে পাহাড়ের সকাল বদলে যায়।

ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই কুয়াশা নেমে এসে পাহাড়, ঝিরি, বাঁশঝাড় আর জুমের ফাঁকা ঢালগুলোকে সাদা নরম চাদরের নিচে ঢেকে দেয়। দূর থেকে কোনো ঘরের চিমনির ধোঁয়া উঠলে মনে হয়, কুয়াশার বুক চিরে কেউ নিঃশব্দে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়েছে।

দেবাছড়া পাড়ায় তখন বড়দিনের অপেক্ষা।

প্রতিটি বাঁশের বাড়িতে ঘরদোর পরিষ্কার হচ্ছে। উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন মায়েরা। ছেলেরা বাঁশ কেটে গির্জার সাজসজ্জার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা রঙিন কাগজ কেটে তারা বানাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসে ক্যারল গানের সুর।

চার বছর আগে যে মেয়েটি চোখের জল লুকিয়ে মিশনারি হোস্টেলে উঠেছিল, সে আজ অনেকটাই বদলে গেছে।

হৈমী এখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। উচ্চতায় মাকে ছুঁইছুঁই। মুখে কৈশোরের কোমলতা, চোখে এক ধরনের স্থিরতা। আগের মতো অকারণে কাঁদে না, আবার অকারণে হাসেও না। কিন্তু তার ভেতরের কোমল মনটি ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।

সেন্ট মেরিস হিল মিশন স্কুলের শিক্ষকেরা এখন তাকে আলাদা করে চেনেন। পড়াশোনায় ভালো বলেই নয়, বরং সবার কাজে এগিয়ে যাওয়ার জন্যও। ছোট ক্লাসের কোনো মেয়ে পড়া বুঝতে না পারলে হৈমী নিজের পড়া শেষ করে তাকে বুঝিয়ে দেয়। কারও জ্বর এলে রাত জেগে মাথায় পানি দেয়। সিস্টার মার্থা প্রায়ই বলেন,

— “মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক ধরনের শিক্ষা।”

কথাটা হৈমী মনে গেঁথে নেয়।

হোস্টেলের ছোট্ট লাইব্রেরিটা এখনও তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সেখানে জানালার পাশে একটি কাঠের বেঞ্চ আছে। বিকেলের পড়া শেষ হলে সে প্রায়ই সেখানে বসে বই পড়ে। জানালার ওপারে সারি সারি পাহাড়। শীতের সকালে কুয়াশা, বর্ষায় পাহাড়ি মেঘ, আর গ্রীষ্মে নীল আকাশ — ঋতু বদলায়, কিন্তু পাহাড় যেন একই সঙ্গে স্থিরও, চলমানও।

কখনও কখনও বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে সে দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, মানুষের জীবনও কি পাহাড়ের মতো? বাইরে শক্ত, ভেতরে কত অজানা ঝিরি বয়ে চলে!

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই হোস্টেলে উৎসবের আমেজ। গির্জায় ক্যারলের মহড়া চলছে। সবাই মিলে রঙিন কাগজে বড় বড় তারা বানাচ্ছে।

লিজা এখনো তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। একদিন মহড়া শেষে দুজনে গির্জার সিঁড়িতে বসে ছিল। চারদিকে কুয়াশা নেমেছে। লিজা হেসে বলল,

— “বাড়ি গেলে প্রথম কী খাবি?”

হৈমী এক মুহূর্তও ভাবল না।

— “মায়ের হাতে জুমের চালের ভাত, আর নাপ্পি দিয়ে রাঁধা পাহাড়ি শাক।”

দুজনেই হেসে উঠল। লিজা বলল,

— ” তোর মুখে খাবারের কথা শুনলেই বুঝি ছুটি এসে গেছে।”

হৈমীও হাসল। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে বাড়ি ফেরার এক অদ্ভুত আকুলতা লুকিয়ে ছিল।

বড়দিনের ছুটি শুরু হওয়ার সকালে জরামণি আবার এলেন মেয়েকে নিতে। প্রতি বছরের মতোই। হৈমী দূর থেকেই বাবাকে চিনে ফেলল — কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ঝোলা, গায়ে মোটা জ্যাকেট, পায়ে বহুদিনের ব্যবহারে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া স্যান্ডেল।

বাবাকে দেখেই সে দৌড়ে গেল। জরামণি মেয়ের মাথায় হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,

— “দেখি তো, আমার মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে!”

হৈমী হেসে উত্তর দিল,

— “আমি বড় হয়েছি, না তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ?”

জরামণি হেসে উঠলেন।

— “জুমের কাজ মানুষকে বুড়ো করে না মা, শুধু হাত দুটোকে শক্ত করে দেয়।”

ফেরার পথটা পাহাড়ের বুক ঘেঁষে এগিয়ে গেছে। শীতের রোদ তখনও কুয়াশার ভেতর দিয়ে পুরোপুরি নামতে পারেনি। বাঁশপাতায় শিশির ঝুলছে। দূরে একটি ঝিরির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

হৈমী হাঁটতে হাঁটতে বলল,

— “বাবা, পাহাড়কে এতদিন পরে দেখলে কেন যেন মনে হয়, ওরা আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।”

জরামণি ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। হেসে বললেন,

— “যে পাহাড়কে ভালোবাসে, পাহাড় তার সঙ্গে কথা বলেই। শুধু সবাই সেই কথা শুনতে পারে না।”

হৈমী আর কিছু বলল না। সে শুধু চারদিকে তাকিয়ে রইল। এই পথ, এই বাঁশবন, এই ঝিরি — সবই তার চেনা। তবু প্রতি বছর ফিরে এসে মনে হয়, পাহাড় যেন তাকে নতুন করে চিনিয়ে দেয় নিজেকেই।

দেবাছড়া পাড়ায় পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। উঠোনে পা রাখতেই ভাই বোনরাদৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। সবচেয়ে ছোট বোনটি লাজুক মুখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। হৈমী নিজেই এগিয়ে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল।

সুবর্ণা দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চোখে আনন্দ, তৃপ্তি আর অদ্ভুত এক শান্তি। তিনি শুধু বললেন,

— “আয় মা, ঘরে আয়।”

সন্ধ্যা নামতেই সবাই মেঝেতে পাটি পেতে একসঙ্গে খেতে বসল। জুমের চালের গরম ভাত, নাপ্পি দিয়ে রাঁধা বাঁশকোরল, শুকনো মরিচ ভর্তা, পাহাড়ি শাক। হৈমীর মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার হয়তো বিলাসী কোনো রান্না নয়; দীর্ঘ অপেক্ষার পর মায়ের হাতে খাওয়া এক থালা ভাত।

খেতে খেতে গল্প চলল। ছোট ভাইরা স্কুলের গল্প বলছে। হৈমী হোস্টেলের গল্প শোনাচ্ছে। সুবর্ণা মাঝেমধ্যে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে মেয়ের কথা শুনছেন। মেয়েটার কথাবার্তায় এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ভাব।

খাওয়া শেষ হলে সবাই আগুনের পাশে গোল হয়ে বসল। বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। জরামণি ধীরে ধীরে বললেন,

— “আগামীকাল রাংছড়া পাড়ায় বড়দিন উপলক্ষে যুবসমাজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আশেপাশের সব পাড়া থেকেই মানুষ যাবে।”

ছোট ভাইটি লাফিয়ে উঠল।

— “আমরাও যাব?”

— “যাব।”

হৈমীর মুখেও হাসি ফুটল। রাংছড়া পাড়ায় সে বহু বছর যায়নি। ছোটবেলার অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই মনে নেই।

রাতে ঘুমানোর আগে ছোট দুই বোন মিলে হৈমীর কাপড়ের ব্যাগ ঘেঁটে দেখতে বসল, কাল কী পরে যাওয়া যায় তাই নিয়ে। মেজো বোনটা একটা লাল ওড়না বের করে বলল,

— “দিদি, এইটা পরিস, তোকে খুব মানাবে।”

হৈমী হেসে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল — একটা পুরনো, চৌকো দাগ পড়া ছোট্ট আয়না, তবু তাতেই নিজেকে দেখে কেমন একটা লজ্জা মেশানো ভালো লাগা কাজ করল তার মধ্যে। ছোট বোনটা ফিক করে হেসে বলল,

— “দিদিকে তো নতুন বউয়ের মতো লাগছে!”

হৈমী বালিশ ছুঁড়ে মারল তার দিকে, আর তিন বোন মিলে হেসে গড়িয়ে পড়ল বিছানায়। এত সহজ, এত নিষ্পাপ একটা রাত — অথচ কাল সকালের অপেক্ষায় হৈমীর বুকের ভেতর একটা অচেনা উত্তেজনা কাজ করছিল, যার কারণ সে নিজেও ঠিক জানত না।

রাত গভীর হলে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু হৈমীর ঘুম এল না। বাঁশের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে শীতের হাওয়া ঢুকছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। আরও দূরে কোনো গির্জায় হয়তো রাতের শেষ প্রার্থনা শেষ হয়েছে।

হৈমী চুপচাপ শুয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, মানুষ যত বড় হয়, ততই তার ভেতরে নতুন নতুন দরজা খুলে যায়। সেই দরজার ওপারে কী আছে, তা আগে থেকে কেউ জানে না।

পরদিনের সকালও ঠিক তেমনই একটি অজানা দরজার সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে দেবে — এ কথা সে তখনও জানত না। শুধু পাহাড়ি কুয়াশা নীরবে চূড়ার পর চূড়া ঢেকে রাখছিল। যেন প্রকৃতিও কিছু একটা গোপন করে রেখেছে।

চতুর্থ পর্ব : কুয়াশার ভিড়ে

“বড়দিনের সকাল।

পাহাড়ের শীতের ভোর যেন পৃথিবীর অন্য সব ভোর থেকে আলাদা। সূর্য ওঠার পরও কুয়াশা টিলার গা ছেড়ে সরে যেতে চায় না। বাঁশবনের ফাঁক গলে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসে, তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে। সেই পরিচিত শব্দে দেবাছড়া পাড়া যেন একসঙ্গে জেগে ওঠে। আজ বড়দিন।

সুবর্ণা ভোরেই উঠেছেন। রান্নাঘরের বাঁশের চুলায় আগুন জ্বলছে। ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে আছে নতুন চালের ভাত আর পাহাড়ি রান্নার গন্ধ। উঠোনে ছোট ভাইবোনেরা নতুন পোশাক পরে উৎসবের আনন্দে ছুটোছুটি করছে।

হৈমী নিজের ঘরে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। হোস্টেলের জীবন তাকে অল্প কয়েক বছরেই অনেকটা পরিণত করে দিয়েছে। আগের মতো আর সবকিছু নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে না, কিন্তু বাড়ি ফিরলেই তার ভেতরের সেই ছোট্ট মেয়েটা যেন আবার জেগে ওঠে।

সুবর্ণা আলমারি থেকে যত্ন করে তুলে আনলেন মেয়ের উৎসবের পোশাক। সাদা বুননের ওপর রঙিন সুতোয় করা সূক্ষ্ম নকশাগুলো তিনি নিজের হাতেই এঁকেছিলেন। চুল বেঁধে দিতে দিতে মৃদু হেসে বললেন,

— “হোস্টেলে গিয়ে তোকে যেন আরও শান্ত লাগছে।”

হৈমী মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

— “শান্ত হয়েছি, না বড় হয়েছি?”

সুবর্ণা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর মায়েরা মুখে দেন না; শুধু চোখে রেখে দেন।

গির্জায় আজ উপচে পড়া ভিড়। শুধু দেবাছড়া পাড়ার মানুষ নয়; আশপাশের রাংছড়া, লংগাছড়া, বলিপাড়া ও আরও কয়েকটি পাহাড়ি পাড়া থেকে মানুষ এসেছে। ত্রিপুরা, মারমা, বম ও খুমি—বিভিন্ন খ্রিস্টান পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ একই প্রার্থনায় অংশ নিয়েছে। ভাষা আলাদা, পোশাকের নকশা আলাদা, কিন্তু উৎসবের আনন্দ যেন সবারই এক।

শিশুদের কণ্ঠে ক্যারলের সুর ভেসে উঠতেই গির্জার ভেতর এক অপূর্ব প্রশান্তি নেমে এল।

প্রার্থনা শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে লাগল। কেউ আত্মীয়ের খোঁজ নিচ্ছে, কেউ বহুদিন পর দেখা হওয়া বন্ধুকে জড়িয়ে ধরছে। প্রবীণরা আগুন পোহাতে পোহাতে গল্প করছেন, আর শিশুরা মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে।

পাহাড়ে বড়দিন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি জনপদগুলোর মানুষকে আবার একত্রে ফিরে পাওয়ার দিন।

দুপুরের দিকে সবাই রওনা দিল রাংছড়া পাড়ার যুবসমাজের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। দেবাছড়া থেকে রাংছড়ার পথ খুব বেশি দূরের নয়। সরু পাহাড়ি পথ ধরে দল বেঁধে মানুষ একই দিকে হাঁটছে। কেউ ক্যারলের সুর গুনগুন করছে, কেউ গল্পে মেতে উঠেছে, আবার কেউ ছোট্ট সন্তানকে কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে।

দুপাশে বাঁশঝাড়। নিচে স্বচ্ছ পানির ঝিরি। কোথাও পাহাড়ি বুনো ফুল, কোথাও শুকনো পাতার ওপর পায়ের মৃদু শব্দ।

হাঁটতে হাঁটতে হৈমীর মনে হলো, পাহাড়কে সে যেন প্রতিবারই নতুন করে আবিষ্কার করে। হয়তো পাহাড় বদলায় না, বদলে যায় মানুষ।

রাংছড়া পাড়ায় পৌঁছাতেই উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য চোখে পড়ল। খোলা মাঠের এক পাশে বাঁশ দিয়ে তৈরি মঞ্চ। রঙিন কাপড়ে সাজানো ছাউনি। চারদিকে কাগজের তারা আর হাতে বানানো সাজসজ্জা। দূরে গির্জার সামনে ঝুলছে আলোকিত বড়দিনের তারা।

মাঠজুড়ে মানুষের ভিড়। শিশুরা খেলছে। কিশোরীরা দল বেঁধে গল্প করছে। যুবকেরা কেউ বেঞ্চ সাজাচ্ছে, কেউ বাদ্যযন্ত্র ঠিক করছে, কেউ অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করছে। প্রবীণরা ধীরে ধীরে এসে সামনের সারিতে বসে পড়েছেন।

হৈমী বাবার পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল।

মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একটি দৃশ্য তার চোখে আটকে গেল। কয়েকজন যুবক মঞ্চের শেষ কাজগুলো গুছিয়ে দিচ্ছিল। তাদের একজন কোনো নির্দেশের অপেক্ষা না করেই যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই হাত লাগাচ্ছিল। কখনও বাঁশের বাঁধন শক্ত করছে, কখনও একজন বৃদ্ধের বসার জন্য বেঞ্চ এগিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনও দৌড়ে গিয়ে ছোট্ট শিশুদের ভিড় থেকে সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ছেলেটির প্রতি নয়, তার কাজের প্রতি চোখ আটকে গেল হৈমীর। মানুষের ভিড়ে কাজে ডুবে থাকা মানুষকে আলাদা করে চোখে পড়তেই পারে।

ঠিক তখন পাশেই দাঁড়ানো একজন প্রবীণ জরামণিকে বললেন,

— “ওই যে নয়ন… লংগাছড়া পাড়ার ছেলে। খুব শান্ত স্বভাবের। কাজের সময় ওকে সবার আগে পাওয়া যায়।”

জরামণি মৃদু হেসে বললেন,

— “দেখেই বোঝা যায়।”

এর বেশি আর কোনো কথা হলো না।

মাঠে তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। প্রথমে শিশুদের সমবেত ক্যারল। তারপর ত্রিপুরা তরুণ-তরুণীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। এরপর মারমা যুবকদের দলীয় সংগীত।

একসময় সবাই মিলে বড়দিনের সমবেত সঙ্গীত গাইতে শুরু করল। পাহাড়ি ভাষার সুর, বাংলা গান, শিশুদের হাসি আর মানুষের হাততালিতে বিকেলটা ধীরে ধীরে উৎসবের রঙে ভরে উঠল।

সূর্য পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে নেমে যেতে শুরু করেছে। কুয়াশাও ধীরে ধীরে মাঠের চারপাশে নেমে আসছে। আলোর মালাগুলো একে একে জ্বলে উঠল। হৈমী একবার চোখ তুলে দেখল, সেই যুবকটি এখনও ব্যস্ত। অনুষ্ঠান প্রায় শেষ, অথচ সে অন্যদের সঙ্গে মিলে মঞ্চের চারপাশ গুছিয়ে দিচ্ছে।

এক মুহূর্তের জন্য দৃশ্যটি তার মনে রয়ে গেল। তারপর আবার সে সবার সঙ্গে ফেরার পথে হাঁটা দিল।

পাহাড়ি পথ তখন সন্ধ্যার কুয়াশায় ঢেকে গেছে। জরামণি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

— “উৎসবের আসল সৌন্দর্য সাজসজ্জায় নয়; মানুষ একে অপরের জন্য কতটুকু কাজ করে, সেটাতেই।”

হৈমী চুপচাপ বাবার পাশে হাঁটছিল। একবার পেছন ফিরে তাকাল। কুয়াশার ভেতর আলোয় ভাসছে মাঠটা। মানুষের মুখ আর আলাদা করে চেনা যায় না। শুধু আলো আর ছায়া মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুখের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় নিঃশব্দে। তখন তারা কেবল ভিড়ের আর-একজন মানুষ। সময়ই একদিন তাদের আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।”

পঞ্চম পর্ব: বিদায়ের সকাল

বড়দিনের উৎসব শেষ হয়েছে দুই দিন।

দেবাছড়া পাড়া আবার তার চিরচেনা ছন্দে ফিরে এসেছে। কদিন আগেও যে পথগুলো মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল, সেখানে এখন শুধু সকালের কুয়াশা নেমে আসে। গির্জার সামনে ঝোলানো বড়দিনের তারাটি এখনও রয়েছে, তবে তার আলো আর উৎসবের জন্য নয়; যেন বিদায় নেওয়া আনন্দের একটি নীরব স্মৃতি।

হৈমী জানত, আজ তারও বিদায়ের দিন।

আগামীকাল থেকে আবার শুরু হবে হোস্টেলের নিয়মমাফিক জীবন। ভোরের ঘণ্টা, নির্দিষ্ট সময়ে পড়াশোনা, প্রার্থনা, ক্লাস, হোস্টেলের শৃঙ্খলা—সবকিছু আবার আগের মতোই চলবে। অথচ এই কয়েকটা দিন সে যেন ভুলেই গিয়েছিল, পাহাড়ের বাইরেও তার আরেকটি জীবন আছে।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল তার। ঘরের অন্যরা তখনও ঘুমিয়ে। আস্তে করে দরজা খুলে সে উঠোনে এসে দাঁড়াল।

ঘাসের ডগায় শিশির জমে আছে। দূরের টিলাগুলো কুয়াশায় আধো দেখা যায়। বাঁশবনের মাথায় বসে নাম না-জানা পাখিরা ডাকছে। শীতের সকালের বাতাসে এমন এক গন্ধ থাকে, যা শুধু পাহাড়েই পাওয়া যায়—ভেজা মাটি, শুকনো বাঁশপাতা আর অরণ্যের নিঃশ্বাস মিশে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত পরিচিত গন্ধ।

হৈমী গভীর করে শ্বাস নিল। মনে হলো, এই গন্ধটুকু যদি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যেত!

পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

— এত সকালে উঠেছিস?

হৈমী ঘুরে তাকাল। সুবর্ণার হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।

— ঘুম ভেঙে গেল।

সুবর্ণা মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন। দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর তিনি মৃদু স্বরে বললেন,

— বাড়ি থেকে ফেরার দিন তোর মুখটা সব সময় এমন হয়ে যায়।

হৈমী হাসার চেষ্টা করল।

— আমার তো থাকতে ইচ্ছে করে।

সুবর্ণা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

— ইচ্ছে সবারই থাকে মা। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু পথ হাঁটতেই হয়।

সকালের নাশতার পর জরামণি বললেন,

— চল, আজ একটু জুমে যাই।

হৈমী অবাক হয়ে তাকাল।

— আজ?

— হ্যাঁ। কাল তো চলে যাবি। যাওয়ার আগে জুমটাকে আরেকবার দেখে আয়।

দুজন বেরিয়ে পড়লেন। সরু পাহাড়ি পথ। দুপাশে বাঁশঝাড়। কোথাও কোথাও শীতের রোদ পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে ছোপ ছোপ আলো ফেলেছে। নিচে একটি সরু ঝিরি বয়ে চলেছে। তার স্বচ্ছ পানিতে ছোট ছোট মাছ দেখা যাচ্ছে।

অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। জরামণির সঙ্গে হাঁটলে এমন নীরবতা অস্বস্তিকর লাগে না। বরং মনে হয়, পাহাড়ও যেন তাদের সঙ্গে হাঁটছে।

জুমে পৌঁছে তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। সামনের ঢালে আগের মৌসুমের ফসল তোলার পর শুকনো ডাঁটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক সপ্তাহ পর নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি শুরু হবে।

জরামণি একমুঠো মাটি হাতে তুলে নিয়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরতে দিলেন।

— দেখছিস?

হৈমী মাথা নাড়ল।

— এই মাটি কাউকে বড়লোক বানায় না। কিন্তু কাউকে না খেয়ে থাকতে দেয় না, যদি সে পরিশ্রম করতে জানে।

কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,

— তুই পড়াশোনা শিখছিস। এটা আমাদের সবার স্বপ্ন। কিন্তু একটা কথা কখনও ভুলবি না—শিক্ষা মানুষকে নিজের শিকড় ভুলতে শেখায় না, বরং শিকড়কে আরও ভালোভাবে চিনতে শেখায়।

হৈমী বাবার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল। জরামণি খুব বেশি কথা বলতেন না। তাই যখন বলতেন, সেগুলো তার মনে গভীরভাবে থেকে যেত।

ফেরার পথে তিনি একটি পাহাড়ি গাছের চারা দেখিয়ে বললেন,

— ওটাকে দেখ।

হৈমী তাকাল। চারা গাছটি পাথরের ফাঁক গলে উঠে এসেছে।

— মাটি কম পেয়েছে, তবু বেঁচে আছে। কারণ শিকড়টা শক্ত করে ধরেছে। মানুষও তেমন।

হৈমীর মনে হলো, আজকের এই হাঁটাটা সে কোনো দিন ভুলবে না।

সন্ধ্যার পর পুরো পরিবার একসঙ্গে খেতে বসল। এমন সুযোগ বছরে খুব বেশি আসে না।

ছোট ভাইটি খেতে খেতে বলল,

— দিদি, পরের বড়দিনেও আসবা তো?

হৈমী হেসে উত্তর দিল,

— প্রভু চাইলে অবশ্যই আসব।

সবচেয়ে ছোট বোনটি বলল,

— আমার জন্য আবার রঙিন ফিতা আনবা।

— আনব।

জরামণি নীরবে সবার কথা শুনছিলেন। তার মুখে হাসি ছিল, কিন্তু চোখে ছিল বিদায়ের গভীর নীরবতা।

পরদিন এখনো আকাশ পুরোপুরি ফোটেনি।

সুবর্ণা ভোরে উঠে মেয়ের ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন। সবকিছু বারবার দেখে নিলেন। শেষে ব্যাগের ভেতর একটি কাপড়ের থলেতে কিছু ভাজা চাল আর গুড় রেখে দিলেন।

হৈমী দেখে ফেলল।

— এত কিছু কেন?

সুবর্ণা মুচকি হেসে বললেন,

— মায়েরা কারণ বলে কিছু করে নাকি?

ঘর থেকে বের হওয়ার আগে পুরো পরিবার একসঙ্গে প্রার্থনা করল। জরামণি প্রার্থনা শেষ করে মেয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

— চল মা।

দেবাছড়া থেকে জিপ স্ট্যান্ড পর্যন্ত পথটুকু তারা হেঁটেই গেলেন। সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি।

জিপ এলে জরামণি আগে ব্যাগ তুলে রাখলেন। তারপর মেয়েকে নিয়ে এক পাশে বসলেন। হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে তবেই তিনি ফিরবেন—এটাই যেন স্বাভাবিক।

জিপ পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে এগিয়ে চলল। কখনও গভীর খাদ, কখনও সবুজ টিলা, কখনও ছোট ছোট বাজার।

মাঝপথে একটি চায়ের দোকানে জিপ থামল। জরামণি দু কাপ গরম চা আর দুটো পিঠা কিনে আনলেন।

হৈমী বলল,

— আপনি খান।

তিনি হেসে বললেন,

— তুই খেলে আমারই খাওয়া হয়।

এর বেশি আর কোনো কথা হলো না। বাবা-মেয়ের সম্পর্কের অনেক কথাই ভাষা ছাড়া বোঝা যায়।

বিকেলের দিকে তারা সেন্ট মেরিস হিল মিশন স্কুলে পৌঁছাল।

হোস্টেলের আঙিনা আগের মতোই শান্ত। কয়েকজন ছাত্রী ইতিমধ্যে ফিরে এসেছে।

সিস্টার স্নেহভরে হৈমীকে দেখে বললেন,

— এসে গেছ?

জরামণি বিনীতভাবে মাথা নত করলেন। তিনি নিজ হাতে মেয়ের ব্যাগটি তার কক্ষে পৌঁছে দিলেন। বিছানার পাশে রেখে একবার চারদিকে তাকালেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে দেখে তবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

বিদায়ের সময় তিনি শুধু বললেন,

— মন দিয়ে পড়বি। আর অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে খবর দিবি।

হৈমী মাথা নাড়ল। কথা বলতে গেলেও গলায় যেন শব্দ আটকে যাচ্ছিল।

জরামণি আর পেছনে তাকালেন না। ধীরে ধীরে হোস্টেলের ফটকের দিকে হাঁটতে লাগলেন।

হৈমী বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখতে লাগল। ফটক পেরিয়ে তিনি যখন পাহাড়ি পথের বাঁকে হারিয়ে গেলেন, তখনই প্রথমবারের মতো হোস্টেলটাকে আবার অচেনা মনে হলো। জীবনের অনেক বিদায় কান্নায় লেখা হয় না। কিছু বিদায় শুধু নীরবে মানুষের ভেতর আরেকটু বড় হয়ে ওঠার সূচনা করে। লেখা হয় না। কিছু বিদায় শুধু নীরবে মানুষের ভেতর আরেকটু বড় হয়ে ওঠার সূচনা করে।

 ষষ্ঠ পর্ব : প্রথম কথার সুর

সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।

বড়দিনের সেই উৎসবের পর দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় একটি বছর। ঋতু বদলেছে, পাহাড়ে নতুন জুম হয়েছে, আবার ফসলও উঠেছে। সেই সময়ের সঙ্গে বদলেছে হৈমীও।

এখন সে নবম শ্রেণির ছাত্রী। শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনেও এসেছে এক ধরনের নীরব পরিণতি। হোস্টেলের নিয়মতান্ত্রিক জীবন তাকে শুধু পড়াশোনাই শেখায়নি; শিখিয়েছে নিজের আবেগ সংযত রাখতে, মানুষের কথা মন দিয়ে শুনতে এবং মনের কথাগুলো নীরবে নিজের ভেতর গুছিয়ে রাখতে।

হোস্টেলে থাকার পর থেকেই তার একটি ছোট অভ্যাস হয়েছে। একটি খাতায় সে মাঝে মাঝে দিনের কোনো সুন্দর মুহূর্ত, নতুন কোনো অনুভূতি কিংবা মনে দাগ কেটে যাওয়া কোনো বাক্য লিখে রাখে। নিয়মিত নয়, তবে যখনই মন চায়।

এবারের বড়দিনটি অন্যরকম আনন্দ নিয়ে এল।

রাংছড়া পাড়ার এক বড় ভাইয়ের বিয়ে। পাহাড়ে বিয়ে মানেই শুধু দুটি মানুষের সংসার শুরু নয়; আশপাশের সব পাড়ার মানুষের একসঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দের উপলক্ষ। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব—সবাই যেন এই উৎসবের অংশ।

জরামণি আর সুবর্ণা সপরিবারে নিমন্ত্রণে গেলেন। হৈমীও গেল ছোট দুই বোনকে নিয়ে। শীতের সকালের রোদে নতুন করে বোনা ত্রিপুরা পোশাক পরে বোনদের সঙ্গে হাসতে হাসতে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল সে।

বিয়ের বাড়িতে পৌঁছাতেই চারদিকে উৎসবের আবহ।

উঠোনজুড়ে মানুষের কোলাহল। এক পাশে বড় বড় হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে। কোথাও তরুণেরা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি শক্ত করে বাঁধছে। মেয়েরা কলাপাতা ধুয়ে সারি করে সাজিয়ে রাখছে। দূরের বাঁশের তৈরি রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠছে।

হৈমী স্বভাবতই চারদিকে পরিচিত মুখ খুঁজতে লাগল।

তার মনে পড়ল লিজার কথা। লিজা থাকলে নিশ্চয়ই দুজনে মিলে পুরো বিয়ের আয়োজন ঘুরে দেখত।

ঠিক তখনই তার চোখ থেমে গেল আরেকটি পরিচিত মুখে।

এক বছর আগে বড়দিনের অনুষ্ঠানে দূর থেকে দেখা সেই ছেলেটি।

নয়ন।

আজও সে আগের মতোই ব্যস্ত। কেউ তাকে ডেকে কাজ দিচ্ছে না, তবু সে নিজেই এক কাজ থেকে আরেক কাজে ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনও ভারী হাঁড়ি তুলে রান্নাঘরে পৌঁছে দিচ্ছে, কখনও বৃদ্ধদের বসার জন্য বেঞ্চ টেনে আনছে, আবার কখনও আগুনের খুব কাছে চলে যাওয়া বাচ্চাদের সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

তার কাজের ভঙ্গিতে কোনো বাড়াবাড়ি নেই, আবার নিজেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টাও নেই।

হৈমী অজান্তেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেজো বোন মুচকি হেসে বলল,

— দিদি, কী দেখছিস?

হৈমী চমকে উঠল।

— কিছু না তো।

— তা হলে এতক্ষণ ধরে ওই দিকেই তাকিয়ে আছিস কেন?

হৈমী হেসে অন্যদিকে তাকাল।

— তুইও না!

মেজো বোন আর কিছু বলল না, শুধু দুষ্টুমি ভরা হাসিটুকু মুখে রেখে চলে গেল।

দুপুরের খাওয়া শেষ হলে চারদিকে একটু শান্ত পরিবেশ নেমে এল। কেউ গল্প করছে, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ আবার উঠোন পরিষ্কার করছে।

হৈমী একটু নিরিবিলি জায়গার খোঁজে বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেল। সেখানে একটি পুরোনো কামরাঙা গাছের নিচে কয়েকটি বাঁশের টুল রাখা ছিল। সে বসে নিজের খাতাটি বের করল।

কলম হাতে নিয়ে কিছু লিখতে যাবে, এমন সময় পায়ের শব্দ শুনে মুখ তুলল।

দেখল, নয়ন।

হাতে একটি ছোট বাঁশের ঝুড়ি। তাতে পাহাড়ি কমলা।

হয়তো কারও কাছে নিয়ে যাচ্ছে।

হৈমীকে দেখে সে ভদ্রভাবে হেসে বলল,

— কমলা খাবেন? আমাদের বাগানের।

হৈমী বিনীতভাবে মাথা নাড়ল।

— ধন্যবাদ। এখন থাক।

নয়নও আর জোর করল না।

দুজনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা রইল।

তারপর নয়ন একটু ইতস্তত করে বলল,

— আপনাকে কোথায় যেন আগে দেখেছি মনে হচ্ছে…

হৈমী মৃদু হেসে উত্তর দিল,

— গত বছরের বড়দিনের অনুষ্ঠানে হয়তো।

নয়নের মুখেও হাসি ফুটল।

— তাই হবে। তখন অনেক ভিড় ছিল।

কিছুটা সাহস পেয়ে সে আবার জিজ্ঞেস করল,

— আপনি কি দেবাছড়া পাড়ার?

— জি।

— আমি লংগাছড়া থেকে।

— জানি। আপনার নাম নয়ন।

নয়ন হালকা বিস্মিত হলো।

— আমার নাম জানলেন কীভাবে?

— গত বছর গ্রামের কয়েকজনের মুখে শুনেছিলাম।

নয়ন মাথা নেড়ে হাসল।

— আর আপনার নাম?

— হৈমী।

নামটি উচ্চারণ করে নয়ন ধীরে বলল,

— সুন্দর নাম।

হৈমীর গাল লাল হয়ে উঠল।

সে দ্রুত বিষয় বদলে বলল,

— আপনি সব সময় এত কাজ করেন?

নয়ন হেসে বলল,

— কাজ করলে সময় ভালো কাটে। আর বিয়ে-বাড়ি তো সবারই।

কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু সাধারণ কথাও কখনও কখনও অদ্ভুতভাবে মনে থেকে যায়।

নয়ন চারদিকে তাকিয়ে বলল,

— আপনি কি সেন্ট মেরিস হিল মিশন স্কুলে পড়েন?

হৈমী অবাক হয়ে বলল,

— হ্যাঁ। আপনি জানলেন কীভাবে?

— আপনার বাবার সঙ্গে একবার একজনের কথা বলতে শুনেছিলাম। বলছিলেন, মেয়েটা নাকি অনেক মন দিয়ে পড়াশোনা করে।

হৈমী লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।

— সবাই বাড়িয়ে বলে।

নয়ন মৃদু হেসে বলল,

— মন দিয়ে পড়াশোনা করা তো ভালো ব্যাপার।

তারপর একটু থেমে যোগ করল,

— আমি ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছিলাম। এরপর আর চালিয়ে যেতে পারিনি। এখন বাবার সঙ্গে জুমের কাজই করি।

কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো আক্ষেপ ছিল না। বরং ছিল শান্ত স্বাভাবিকতা।

হৈমীর সেটাই ভালো লাগল।

এরপর দুজনে আরও কিছুক্ষণ গল্প করল—বিয়ের আয়োজন, এ বছরের শীত, পাহাড়ের কমলার ফলন, হোস্টেলের জীবন; একেবারেই সাধারণ কিছু বিষয়।

কোনো বড় কথা নয়।

কোনো নাটকীয়তা নয়।

তবু কথাগুলোর ভেতরে এক ধরনের সহজ আন্তরিকতা ছিল।

ঠিক তখনই দূর থেকে কেউ ডাকল,

— নয়ন! এদিকে আয় তো!

নয়ন উঠে দাঁড়াল।

— যাই। কাজ আছে।

কয়েক কদম এগিয়ে আবার থেমে ফিরে তাকাল।

হৈমীর হাতে থাকা খাতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

— লিখতে ভালো লাগে?

হৈমী খাতাটা আলতো করে বন্ধ করল।

— মাঝে মাঝে… যা মনে আসে।

নয়ন বলল,

— ভালো অভ্যাস। লিখে রাখলে অনেক কিছু মনে থাকে।

এই বলে সে চলে গেল।

হৈমী অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

খাতাটা খুলেও আর কিছু লিখতে পারল না।

সে নিজেই বুঝতে পারছিল না, এত সাধারণ একটি আলাপ বারবার কেন মনে পড়ছে।

বিকেলের দিকে সবাই যখন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, হৈমী একবার চারদিকে তাকাল।

দূরে নয়ন এখনও কাজ করছে। প্যান্ডেলের বাঁশ খুলতে অন্যদের সাহায্য করছে।

হঠাৎ একবার চোখাচোখি হয়ে গেল।

কেউ হাত নাড়ল না।

কেউ কিছু বলল না।

শুধু দুজনের মুখেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।

ফেরার পথে মেজো বোন আবার খোঁচা দিল,

— দিদি, এতক্ষণ কী গল্প হলো?

হৈমী হাসল।

— তেমন কিছু না।

— তোমার মুখটা কিন্তু অন্য কথা বলছে।

হৈমী কোনো উত্তর দিল না। শুধু বোনের হাতটা আলতো করে চেপে ধরল।

রাতে ঘুমানোর আগে সে নিজের খাতাটা বের করল। অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে লিখল—

“আজ একটা নতুন নাম আবার মনে পড়ল। অদ্ভুত ব্যাপার, কিছু নাম হয়তো খুব সাধারণভাবেই জীবনে আসে; তবু সহজে মন থেকে মুছে যায় না।”

খাতাটা বন্ধ করে সে বালিশের নিচে রেখে দিল।

জানালার বাইরে পাহাড়ের শীতের রাত নেমে এসেছে। দূরে কোথাও শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা।

হৈমী তখনও জানত না, মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার শুরুটা অনেক সময় কোনো বড় ঘটনার মধ্য দিয়ে হয় না। কখনও কখনও একটি সাধারণ বিকেল, কয়েকটি বিনয়ী বাক্য আর একটি নাম—নীরবে ভবিষ্যতের দিকে একটি অদৃশ্য দরজা খুলে দেয়।”

সপ্তম পর্ব : সম্পর্কের গভীরতা

বিয়ে বাড়ির সেই বিকেলের পর জীবন আবার নিজের ছন্দে ফিরে গেল।

পাহাড়ের ঋতুগুলো যেমন নিঃশব্দে বদলে যায়, তেমনি বদলাতে লাগল দিন, মাস আর বছর। জুমে নতুন চারা উঠল, বর্ষার জলে পাহাড় ধুয়ে গেল, আবার শীত নেমে এল কুয়াশার চাদর মেলে। এই পরিবর্তনের মাঝেই হৈমী ধীরে ধীরে নবম শ্রেণির পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হয়ে উঠল।

হোস্টেলের জীবন আগের মতোই নিয়মে বাঁধা। ভোরের ঘণ্টা, প্রার্থনা, ক্লাস, বিকেলের খেলাধুলা, সন্ধ্যার অধ্যয়ন—সবকিছু যেন একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলতে থাকে। তবু সেই ব্যস্ততার মাঝেও কখনো কখনো একটি নাম অকারণেই মনে ভেসে ওঠে—নয়ন।

হৈমী নিজেও বুঝতে পারত না কেন এমন হয়।

সেদিনের কথোপকথন তো ছিল খুবই সাধারণ। কয়েকটি বিনয়ী বাক্য, কিছু হাসি আর বিদায়। তবু সেই স্মৃতিটুকু সময়ের সঙ্গে মুছে যাওয়ার বদলে যেন আরও শান্তভাবে মনের ভেতর জায়গা করে নিচ্ছিল।

এক রাতে পড়া শেষ করে লিজা লক্ষ্য করল, হৈমী বই খুলে বসে থাকলেও অনেকক্ষণ ধরে একই পাতায় চোখ রেখে আছে।

সে হেসে বলল,

— কী রে, বই পড়ছিস, না পাহাড় দেখছিস?

হৈমী চমকে উঠে বইয়ের পাতা উল্টে দিল।

— পড়ছি তো।

— তা হলে একই পাতায় এতক্ষণ কেন?

হৈমী কিছু না বলে হেসে ফেলল।

সেই রাতেই আলো নিভে যাওয়ার পর লিজার জোরাজুরিতে সে বিয়ে বাড়ির ঘটনাটা খুলে বলল। কমলার ঝুড়ি, কামরাঙা গাছের নিচের আলাপ, আর নয়নের নাম—সবই।

সব শুনে লিজা মৃদু হেসে বলল,

— মানুষকে চেনা সব সময় অনেক কথা বলার ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো দু-চারটি কথাও মনে থেকে যায়।

হৈমী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— জানি না কেন বারবার মনে পড়ে।

লিজা উত্তর দিল,

— সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।

তারপর আর কেউ কিছু বলল না।

দুজনেই জানালার বাইরে পাহাড়ের অন্ধকারে তাকিয়ে রইল।

বছরে কয়েকবার ছুটিতে বাড়ি ফিরত হৈমী।

বড়দিন, ইস্টার কিংবা গ্রীষ্মের ছুটি—এই কয়েকটি সময়ই পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাটানোর সুযোগ মিলত।

এসব ছুটির কোনো না কোনো দিনে নয়নের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত।

কখনো গির্জার উঠোনে।

কখনো সাপ্তাহিক হাটে।

কখনো কোনো আত্মীয়ের বাড়ির উঠোনে।

প্রতিবারই কথাবার্তা খুব সামান্য।

কেমন আছ?

পড়াশোনা কেমন চলছে?

জুমে এ বছর ফসল কেমন?

শীত কি এবার একটু বেশি?

সাধারণ প্রশ্ন, সাধারণ উত্তর।

তবু অদ্ভুতভাবে দুজনেই যেন পরের দেখা হওয়া পর্যন্ত সেই সামান্য কথাগুলো মনে রাখত।

একদিন গির্জা থেকে ফেরার পথে নয়ন বলল,

— তুমি আগের চেয়ে অনেক ব্যস্ত হয়ে গেছ মনে হচ্ছে।

হৈমী হেসে উত্তর দিল,

— নবম শ্রেণির পড়া আগের চেয়ে কঠিন।

— ভালোই। পড়াশোনা ছেড়ে দিও না।

কথাটা খুব সাধারণ হলেও হৈমীর মনে গেঁথে রইল।

কিছুদিন পর লিজার মাধ্যমেই একটি ছোট্ট চিঠি এল।

খামের ওপর শুধু লেখা ছিল—

“হৈমীর জন্য।”

চিঠির ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন।

আশা করি ভালো আছ। পড়াশোনায় মন দিও। আমাদের জুমে এ বছর কমলার ফলন ভালো হয়েছে। সময় পেলে তোমাদের জন্য কিছু পাঠাব। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। — নয়ন

হৈমী চিঠিটি কয়েকবার পড়ল।

তারপর খুব যত্ন করে নিজের খাতার ভেতর রেখে দিল।

উত্তর দেবে কি না, অনেকক্ষণ ভেবে শেষে লিখল—

আমি ভালো আছি। পড়াশোনার চাপ বেড়েছে। তোমাদের সবার জন্য প্রার্থনা করি। তুমিও ভালো থেকো।

চিঠিটি ছিল সংক্ষিপ্ত, সংযত এবং একেবারেই সাধারণ।

তবু উত্তরটি লিখে শেষ করার পর তার মনে এক ধরনের স্বস্তি নেমে এল।

এরপর থেকে খুব ঘন ঘন নয়, বছরে দু-একবার এভাবেই খবরের আদান-প্রদান হতে লাগল। কোনো চিঠিতেই বড় বড় কথা ছিল না। ছিল না ভালোবাসার ঘোষণা কিংবা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। ছিল শুধু পরস্পরের খোঁজ নেওয়া, পড়াশোনার খবর, পরিবারের কথা আর ঈশ্বরের আশীর্বাদের প্রার্থনা।

হৈমী বুঝতে শিখছিল, অনেক সম্পর্ক শব্দের চেয়ে নীরবতায় বেশি বেঁচে থাকে।

নবম শ্রেণির শেষদিকে একদিন সিস্টার মার্থা তাকে ডেকে বললেন,

— তোমার ফলাফল খুব ভালো। কিন্তু মনে রেখো, সামনে আরও কঠিন পথ।

হৈমী মাথা নাড়ল।

— চেষ্টা করব, সিস্টার।

— শুধু চেষ্টা নয়, নিয়মও ধরে রাখতে হবে। অনেকেই ভালো শুরু করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না।

সেদিনের কথাগুলো হৈমী গভীরভাবে মনে গেঁথে নিল।

সে বুঝল, নিজের স্বপ্নের কাছে পৌঁছাতে হলে আবেগের চেয়ে অধ্যবসায়ই বড়।

সময় আবার এগিয়ে গেল।

হৈমী দশম শ্রেণিতে উঠল।

এবার হোস্টেলের পরিবেশও বদলে গেল।

সিনিয়রদের মুখে একটাই কথা—

এসএসসি।

প্রতিদিন অতিরিক্ত ক্লাস।

সাপ্তাহিক পরীক্ষা।

মডেল টেস্ট।

রাত পর্যন্ত পড়ার চাপ।

হোস্টেলের করিডোরেও যেন আগের হাসি-আনন্দ কিছুটা কমে এসেছে।

সবাই নিজের নিজের বই নিয়ে ব্যস্ত।

বড়দিনের ছুটিতে বাড়ি গিয়েও হৈমী খুব বেশি সময় বাইরে কাটাতে পারল না।

এক বিকেলে গির্জার প্রাঙ্গণে নয়নের সঙ্গে দেখা হলো।

শীতের নরম আলো তখন পাহাড়ের গায়ে পড়েছে।

নয়ন মৃদু হেসে বলল,

— পরীক্ষা তো আর বেশি দূরে নেই।

— হ্যাঁ। ভাবলেই ভয় লাগে।

— ভয় পেলে হবে?

— মাঝে মাঝে হয়।

নয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— তুমি সব সময়ই সাহসী ছিলে। এবারও পারবে।

হৈমী হাসল।

— ঈশ্বর চাইলে।

নয়ন মাথা নাড়ল।

— আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করব।

কথাটা শুনে হৈমীর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এল।

সেদিন আর খুব বেশি কথা হয়নি।

দুজনেই বুঝতে পারছিল, সামনে এমন একটি সময় আসছে যখন দেখা-সাক্ষাৎ, চিঠি কিংবা গল্প—সবকিছুই পড়াশোনার চাপে অনেকটাই কমে যাবে।

ছুটি শেষ হলে হৈমী আবার হোস্টেলে ফিরে এল।

এরপর শুরু হলো তার জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।

ভোরের প্রার্থনা থেকে রাতের শেষ অধ্যয়ন পর্যন্ত প্রতিটি দিন যেন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা।

খাতার পর খাতা নোট।

অসংখ্য অনুশীলনী।

মডেল টেস্ট।

শিক্ষকদের পরামর্শ।

সিস্টার মার্থার উৎসাহ।

এই ব্যস্ততার মধ্যেও মাঝে মাঝে সে নিজের ছোট্ট খাতাটি খুলে বসত।

কখনো কিছু লিখত।

কখনো শুধু একটি শুকনো পাতা কিংবা পুরোনো একটি চিঠির দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকত।

তারপর আবার বই খুলে পড়ায় মন দিত।

কারণ সে জানত, সামনে যে পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, সেটি শুধু একটি বোর্ড পরীক্ষা নয়—তার ভবিষ্যতের পথও অনেকটাই নির্ধারণ করে দেবে।

পাহাড়ের আকাশে তখন বসন্তের প্রথম মেঘ ভেসে বেড়াতে শুরু করেছে।

আর হৈমী, নিজের সমস্ত স্বপ্ন, প্রার্থনা আর নীরব অনুভূতিগুলো বুকের ভেতর যত্ন করে রেখে, এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সম্পূর্ণ মনোযোগী হয়ে উঠল।

অষ্টম পর্ব: নিঃশব্দে ঝরা পাতা

এসএসসি পরীক্ষার শেষ দিনের সকালটা অন্য সব দিনের মতো শুরু হলেও, হৈমীর কাছে দিনটির ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত ভার আর হালকা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি—দুটোই পাশাপাশি। ভোরের প্রার্থনায় দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, গত দুই বছর যেন এক দীর্ঘ পাহাড়ি পথ—কখনও কুয়াশায় ঢাকা, কখনও রোদে ঝলমলে। সেই পথের শেষ বাঁকে এসে আজ দাঁড়িয়ে আছে সে।

সিস্টার মার্থা প্রার্থনা শেষে মৃদু হেসে বললেন,

— আজ তোমাদের শেষ পরীক্ষা। ফলাফল নিয়ে এখনই ভাববে না। প্রভু তোমাদের জন্য উত্তম পথই নির্ধারণ করে রেখেছেন।

বিদায়ের আগে তিনি হৈমীকে আলাদা ডেকে বললেন,

— তোমাকে ছোটবেলা থেকে দেখছি। পড়াশোনা কখনও ছেড়ে দেবে না। পাহাড়ের মেয়েরা যদি পড়ে, পুরো পরিবার এগিয়ে যায়।

মাথায় হাত রেখে প্রার্থনা করলেন তিনি। হৈমী নিচু হয়ে সিস্টারের হাত ছুঁয়ে সালাম জানাল।

দেবাছড়া পাড়ায় পৌঁছাতেই ভাইবোনেরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।

— দিদি, এবার কিন্তু অনেক দিন থাকবে!

সুবর্ণা মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,

— কত শুকিয়ে গেছিস রে!

জরামণি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বললেন,

— প্রভুর কৃপায় ভালোভাবেই ফিরেছ, মা। এই তো আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

প্রথম কয়েকটা দিন চোখের পলকে কেটে গেল—ভোরে রান্নাঘরে মায়ের সঙ্গে কাজ, দুপুরে ভাইবোনদের পড়া দেখানো, বিকেলে বাবার সঙ্গে জুমে যাওয়া।

একদিন জুম থেকে ফেরার পথে জরামণি বললেন,

— পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এবার একটু বিশ্রাম নে। ফল বের হলে আবার নতুন করে ভাবতে হবে।

হৈমী মৃদু স্বরে বলল,

— যদি ভালো ফল করতে পারি, বাবা… আমি আরও পড়তে চাই।

জরামণি কিছুক্ষণ নীরবে হাঁটলেন। তারপর বললেন,

— ইচ্ছে থাকলে পথও বের হয়। আমরা গরিব, কিন্তু মেয়ের স্বপ্নের সামনে গরিবি যেন বাধা না হয়—প্রার্থনা করি, প্রভু সেই শক্তি দিন।

হৈমীর চোখ অজান্তেই ভিজে উঠল।

সেই রবিবার গির্জার আঙিনায় অনেকের সঙ্গে কথা হলো, কিন্তু একটা মুখ কোথাও দেখা গেল না—নয়ন। প্রথমে সে ব্যাপারটা গুরুত্ব দিল না। নিজেকে বোঝাল, হয়তো জুমের কাজে ব্যস্ত।

কিন্তু পরের সপ্তাহেও হাটে, গির্জায়, কোথাও তার দেখা মিলল না।

কাছের একজন বলল,

— এই সময় লংগাছড়ার ওদিকে জুমের কাজ খুব বেড়েছে। ছেলেপেলেরা ভোরে বের হয়, সন্ধ্যার আগে ফেরে না।

কথাটা শুনে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করল হৈমী। তবু বুকের ভেতর অল্প অল্প করে একটা শূন্যতা জন্ম নিতে শুরু করল।

প্রায় দুই সপ্তাহ পর উঠোনে বসে সুবর্ণার সঙ্গে শুকনো মরিচ বাছছিল হৈমী। পাশের বাড়ির জয়ন্তী খালা এসে গল্পের ফাঁকে বললেন,

— শুনেছো? লংগাছড়ার নয়নের নাকি বিয়ের কথা চলছে।

হৈমীর হাত থেকে একটা শুকনো মরিচ মাটিতে পড়ে গেল। সে নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল। কাউকে বুঝতে না দিয়ে নিজেকে বলল—গাঁয়ের কথা, কত কথাই তো ওঠে; সব কি সত্যি হয়?

কিন্তু দুদিন পর জরামণির এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে এসে বললেন,

— জরামণি ভাই, লংগাছড়ার নয়নের বিয়ের তারিখও ঠিক হয়ে গেছে শুনলাম। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই।

পাশের ঘরে চাল বাছতে বসা হৈমীর কাছে প্রতিটি শব্দ যেন আলাদা করে কানে বাজল। হাতের চাল ঝাপসা হয়ে এল চোখে। নিঃশব্দে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল সে।

সেদিন বিকেলে পুরোনো কাঠের বাক্স খুলে নয়নের লেখা ছোট ছোট চিঠিগুলো বের করল। কোথাও বড় প্রতিশ্রুতি নেই, শুধু সাধারণ কিছু বাক্য।

“পড়াশোনা মন দিয়ে কোরো।”

“একদিন তুমি অনেক দূর যাবে।”

অক্ষরগুলো একই রকম আছে; বদলে গেছে শুধু সময়।

পরদিন রবিবার। গির্জার উঠোনে দাঁড়িয়ে হৈমীর চোখ বারবার ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজছিল। নয়ন এল না।

ঠিক তখনই গির্জার বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক এগিয়ে এসে একটা ভাঁজ করা খাম বাড়িয়ে দিলেন।

— লংগাছড়ার নয়ন দিয়ে গেছে।

হৈমীর হাত কাঁপছিল। গির্জার পেছনের পুরোনো আমগাছের নিচে বসে খামটা খুলল সে।

হৈমী,

এই চিঠি লেখার সাহস পেতে আমার অনেক দিন লেগেছে।

তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি আমি কখনও দিইনি, তবু জানি তোমার নীরব বিশ্বাসের কাছে আমি ঋণী হয়ে আছি।

তুমি কত দূর পড়াশোনা করেছ, কত স্বপ্ন দেখো চোখে—আর আমি ক্লাস টেনের পর আর এগোতে পারিনি, বাবার সঙ্গে জুমেই আটকে গেছি। তোমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা আমার নেই, এটা অনেকদিন ধরেই বুঝতে পারছিলাম; শুধু নিজেকে স্বীকার করতে সময় লেগেছে।

আমি জানি, তুমি বলবে এসব কিছু না, ভালোবাসায় হিসাব চলে না। কিন্তু আমি চাই না আমার জন্য তোমার পথ কোনোদিন থেমে যাক, বা তুমি আমার কারণে পিছিয়ে পড়ো। তাই নিজে থেকেই সরে দাঁড়ালাম, তোমাকে কিছু না জানিয়েই। হয়তো এটাও ঠিক করিনি, কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে বলার মতো সাহসও আমার ছিল না।

তুমি আমার ওপর রাগ করো, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু নিজের স্বপ্নের ওপর কখনও রাগ কোরো না। তুমি পড়বে, অনেক দূর যাবে। যেদিন তোমার সাফল্যের খবর শুনব, সেদিন প্রভুর কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

আমাকে ক্ষমা করে দিও।

— নয়ন

চিঠি পড়া শেষ করেও অনেকক্ষণ একইভাবে বসে রইল হৈমী। চোখ দিয়ে জল গড়াল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সেদিন তার কান্নাও যেন নীরব হতে শিখেছিল।

আকাশে মেঘ জমছিল। এক ঝলক বাতাসে আমগাছের শুকনো পাতা ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। হৈমীর মনে হলো, কিছু কিছু সম্পর্কও শুকনো পাতার মতো—নিঃশব্দে একদিন ডাল ছেড়ে নেমে আসে। কোনো শব্দ হয় না, শুধু ভেতরে ঋতু বদলে যায়।

সেই রাতে ডায়েরির সাদা পাতায় সে শুধু লিখল—

“প্রভু, আমার পথটা তুমি দেখিয়ে দিও।”

চিঠিগুলো সে পুড়িয়ে ফেলল না, আবার বুকের কাছেও রাখল না। যত্ন করে আগের চিঠিগুলোর সঙ্গে একই কাপড়ে জড়িয়ে কাঠের বাক্সে তুলে রাখল। যেন কিছু স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য নয়, শুধু যথাস্থানে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।

সুবর্ণা বুঝতে পারছিলেন, মেয়েটা আগের মতো নেই। হাসছে, কথা বলছে, তবু সেই হাসিতে কোথাও আলো কমে গেছে।

এক রাতে জিজ্ঞেস করলেন,

— কী হয়েছে রে? পরীক্ষার চিন্তা?

হৈমী মৃদু হেসে বলল,

— হয়তো তাই।

সুবর্ণা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। প্রত্যেক সন্তানের জীবনেই এমন কিছু দরজা থাকে, যেখানে মা দাঁড়িয়ে থাকেন ঠিকই, কিন্তু অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢোকেন না।

কয়েক দিন পর হোস্টেলে ফেরার সময় হলো। পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে জরামণি বললেন,

— জীবনে সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হয় না, মা। কিন্তু মানুষ যদি সততা আর পরিশ্রম ধরে রাখতে পারে, প্রভু কখনও তাকে খালি হাতে ফেরান না।

হৈমী শুধু বলল,

— আমি পড়াশোনা ছাড়ব না, বাবা।

জরামণির মুখে শান্ত হাসি ফুটে উঠল।

— এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিলাম।

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ঘনিয়ে এলো। তাই হৈমী আবার হোস্টেলে ফিরে গেল।

হোস্টেলে ফিরে লিজা প্রথম দেখাতেই বুঝে গেল, কিছু একটা বদলে গেছে। রাতে আলো নেভার পর হৈমী কাঠের বাক্স থেকে চিঠিটা বের করে তার হাতে দিল।

পড়া শেষ করে লিজা বলল,

— জানিস, আমি তোর জায়গায় থাকলে হয়তো খুব রাগ করতাম।

— আমারও রাগ হয়েছিল।

— এখন?

জানালার বাইরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে হৈমী বলল,

— এখন শুধু কষ্ট হয়। কিন্তু ওর ওপর না… হয়তো সময়ের ওপর।

লিজা তার হাত ধরে বলল,

— আমি জানি না কেন এমন হয়। কিন্তু তুই একা না। আমি আছি।

হৈমী উত্তর দিল না। কিন্তু বহুদিনের মধ্যে প্রথমবার তার মনে হলো, কষ্টটা হয়তো সারাজীবন একই রকম থাকবে না।

অবশেষে ফল প্রকাশের দিন এল।

দুপুরে সিস্টার মার্থা তালিকা হাতে বেরিয়ে এসে নাম পড়তে শুরু করলেন। হঠাৎ তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

— হৈমন্তী ত্রিপুরা। প্রথম বিভাগ। খুব ভালো ফল করেছে।

লিজা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। সিস্টার মার্থা বললেন,

— অভিনন্দন, হৈমন্তী। আজ তোমার বাবা-মা খুব গর্ব করবেন।

হৈমীর চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু এবার সেই জল শুধু দুঃখের ছিল না। তার মনে হলো, মানুষের জীবন একই সঙ্গে হারানো আর পাওয়ার গল্পও হতে পারে।

দেবাছড়া পাড়ায় খবর পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। জরামণি নীরবে বসে শুধু বললেন,

— ধন্যবাদ, প্রভু।

সুবর্ণা গির্জায় গিয়ে একটি মোমবাতি জ্বালালেন।

হোস্টেলের কাজ শেষ করে পরদিন জরামণি হৈমীকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

সেই রাতে জরামণি বললেন,

— এখন পাহাড়ের বাইরে গিয়ে পড়তে হবে, মা। পথ সহজ হবে না। কিন্তু তুই সাহস না হারালে, আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী সব করব।

হৈমী বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে মাথা নাড়ল।

জানালার বাইরে পাহাড়ের মাথায় তখন শেষ বিকেলের আলো নিভে আসছে। সে অনুভব করল, জীবনের একটা অধ্যায় নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেছে।

নয়নের স্মৃতি সে ফেলে যাবে না, দেবাছড়া পাড়াও নয়। কারণ মানুষ কখনও নিজের শিকড় ছেড়ে যায় না; শুধু সেই শিকড়ের শক্তি নিয়েই নতুন আকাশের দিকে হাঁটতে শেখে। পাহাড় তখনও তার পেছনে রয়ে গেল, কিন্তু সে জানত—কিছু পথ সামনে এগোতে হলে পাহাড়কে পেছনে ফেলে নয়, হৃদয়ের ভেতর নিয়েই হাঁটতে হয়।

নবম পর্ব: শহরের আকাশ, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন

এসএসসির ফল প্রকাশের পর দেবাছড়া পাড়ায় কয়েকটা দিন যেন অন্যরকম আলোয় ভরে উঠেছিল। জরামণি ত্রিপুরার বড় মেয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করেছে — খবরটা অল্প সময়েই এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ল। রবিবারের উপাসনা শেষে অনেকেই এগিয়ে এসে হৈমীর মাথায় হাত রেখে বলতেন, “প্রভু তোমার পথ আরও উন্মুক্ত করুন, মা।”

ছোটবেলা থেকে হৈমী বিশ্বাস করত, শিক্ষা মানুষকে শুধু চাকরি দেয় না, নিজের পৃথিবীটাকেও বড় করে দেয়। জরামণিও সেই স্বপ্ন জানতেন। সন্ধ্যায় উঠোনে বসে তিনি বলতেন,

— আমার যতটুকু সাধ্য আছে, ততটুকু দিয়ে চেষ্টা করব। তুই শুধু পড়াশোনা ছাড়িস না।

কিন্তু সে বছর বর্ষা অদ্ভুত রকমের দীর্ঘ হলো। প্রথম বৃষ্টিতে গ্রামের মানুষ খুশিই হয়েছিল, জুমের ধান ভালো দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বৃষ্টি আশীর্বাদ থেকে পরীক্ষায় পরিণত হলো। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা একসময় মাটির বুক কেটে ফেলতে শুরু করল।

এক ভোরে জরামণি জুম দেখতে গিয়ে দুপুরে ফিরলেন, কাঁধে কোদাল, চোখে অদ্ভুত এক নীরবতা। উঠোনে বসে ভেজা মাটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,

— পাহাড়ের একটা অংশ ধসে পড়েছে। ধানের অনেকটা মাটির নিচে চলে গেছে। আদা-হলুদের জমিও ক্ষতিগ্রস্ত।

সুবর্ণা নিঃশব্দে বসে রইলেন। ঘরে আগের বছরের কিছু ধান-চাল-বীজ মজুত থাকায় সংসারে তখনই অভাব নামেনি, কিন্তু জরামণি জানতেন, এই বছরের ক্ষতির হিসাব মেটাতে হবে আগামী বছর।

এক রাতে ঘুম ভেঙে হৈমী রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ আলো দেখে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে মা-বাবা আস্তে কথা বলছিলেন।

— কলেজে ভর্তি হলে মেয়েটাকে শহরে পাঠাতেই হবে। থাকার খরচ, বই, যাতায়াত… অনেক টাকা লাগবে।

জরামণি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— জুমটা ভালো থাকলে এতটা চিন্তা করতাম না। এবার প্রভু অন্য পরীক্ষা দিলেন।

দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে হৈমীর মনে হলো, বাবা যেন প্রথমবার নিজের অসহায়ত্ব লুকাতে পারছেন না। সেই রাতে তার চোখে ঘুম এল না — একদিকে বহুদিনের স্বপ্ন, অন্যদিকে বাবার নীরব মুখ আর পাঁচ ভাইবোনের ভবিষ্যৎ। ভোরের দিকে বৃষ্টি থামলে সে নিজের মনেই একটা সিদ্ধান্ত নিল — বাবাকে আর কঠিন হিসাবের সামনে দাঁড় করাবে না। কলেজে পড়ার স্বপ্ন আপাতত অপেক্ষা করবে।

সিদ্ধান্ত মুখে বলা সহজ ছিল না। এক সন্ধ্যায় জরামণি উঠোনে বাঁশের ঝুড়ি মেরামত করছিলেন, হৈমী পাশে গিয়ে বসল।

— বাবা, আমি এখনই কলেজে ভর্তি হব না। কিছুদিন কাজ করব, তারপর পড়ব।

জরামণির হাত থেমে গেল।

— কেন?

— সেদিন রাতে তোমাদের কথা শুনে ফেলেছিলাম।

জরামণি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। রাতে পুরো পরিবারে কথা হলো। সুবর্ণা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— তুই তো ছোটবেলা থেকে শুধু পড়তেই চেয়েছিস।

— স্বপ্নটা ছেড়ে দিচ্ছি না মা, শুধু একটু সময়ের জন্য সরিয়ে রাখছি।

ঠিক সেই সময় দেবাছড়া পাড়ায় এলেন সুবর্ণার দূরসম্পর্কের আত্মীয়া মার্গারেট খালা, বহু বছর ধরে ঢাকায় একটা বিউটি পার্লারে কাজ করেন। রাতে গল্পের ফাঁকে তিনি বললেন,

— এখন অনেক পাহাড়ি মেয়েই ঢাকায় কাজ করছে। যদি রাজি থাকো, আমি চেষ্টা করতে পারি। আমাদের পার্লারে মাঝেমধ্যে নতুন মেয়ে নেওয়া হয়।

হৈমী নিচু স্বরে বলল,

— কাজ শিখতে যত সময়ই লাগুক, শিখব খালা।

মার্গারেট খালা মৃদু হেসে বললেন,

— শুধু একটা কথা মনে রাখিস — শহরে কাজ শেখার চেয়ে মানুষ চেনা অনেক কঠিন।

প্রস্তুতি বলতে তেমন কিছুই ছিল না — দুটো সালোয়ার-কামিজ, একটা উষ্ণ শাল, কয়েকটা বই, একটা ডায়েরি, আর সেই পুরনো কাঠের বাক্স, যা সে না খুলেই ব্যাগে তুলে রাখল। কিছু স্মৃতি বারবার পড়ার জন্য নয়, সঙ্গে বহন করার জন্য।

যাত্রার আগের রাতে পুরো পরিবার একসঙ্গে প্রার্থনা করল। প্রার্থনা শেষে সুবর্ণা নিজের গলার ছোট কাঠের ক্রুশটা খুলে মেয়ের হাতে দিলেন।

— এটা অনেক বছর ধরে সঙ্গে রেখেছি। এবার তুই রাখ। খুব একা লাগলে মনে করবি, প্রভু কখনও কাউকে একা পথ চলতে দেন না।

ভোরের আলো ফোটার আগেই সবাই জিপস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলো। সুবর্ণা মেয়ের হাতে শুকনো খাবার আর একটি ছোট বাইবেলসহ একটি পুঁটলি দিলেন। জরামণি যত্নে ভাঁজ করা কিছু টাকা বের করে বললেন,

— এটা টাকার মূল্য না। একজন বাবার আশীর্বাদ।

হৈমী বাবার হাত দুটো কপালে ছুঁইয়ে নিল। জিপ চলতে শুরু করলে পাহাড়ি বাঁকগুলো একে একে পিছিয়ে যেতে লাগল। হৈমীর মনে হলো, পাহাড় কোথাও যাচ্ছে না, বরং সেও পাহাড়কে নিজের ভেতরে নিয়েই অচেনা এক জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাস যখন ঢাকায় পৌঁছাল, হৈমীর মনে হলো সে অন্য এক পৃথিবীতে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে মানুষ আর মানুষ, অবিরাম হর্ন, ডিজেলের গন্ধ, ধুলোর ঝাপটা।। বাতাসও পাহাড়ের মতো শীতল নয় — ভারী, উষ্ণ, ক্লান্তিতে ভরা।

মার্গারেট খালা ব্যাগ হাতে নিয়ে বললেন,

— ব্যাগটা সব সময় নিজের কাছে রাখবি। শহরে ভালো মানুষও আছে, সুযোগসন্ধানীও আছে। রাস্তা পার হতে তাড়াহুড়ো করবি না, এখানে গাড়ি কারও জন্য থামে না।

সিএনজিতে করে যেতে যেতে জানালার বাইরে উঁচু ভবন, ব্যস্ত ফুটপাথ, সিগন্যালে দাঁড়ানো অসংখ্য গাড়ি দেখে হৈমীর মনে পড়ল দেবাছড়া পাড়ার সেই সরু পথ, যেখানে আধঘণ্টা অপেক্ষা করেও একটা গাড়ি দেখা যেত না।

প্রায় এক ঘণ্টা পর সিএনজি একটা শান্ত গলিতে থামল — তিনতলা ভবন, গেটের পাশে সাইনবোর্ড: “সেন্ট অ্যানস উইমেন্স হোস্টেল।” ভেতরে মধ্যবয়সী এক নারী স্নেহভরে বললেন,

— ভয় পেও না মা। এখানের মেয়েদের বেশিরভাগই বাড়ি ছেড়ে কাজ করতে এসেছে। প্রথম কয়েকটা দিন কঠিন লাগে, তারপর সব পরিচিত হয়ে যায়।

ছোট্ট, পরিপাটি ঘর — চারটে খাট, চারটে আলমারি। মার্গারেট খালা ব্যাগ রেখে বললেন, আজ বিশ্রাম নিতে, কাল সকালে পার্লারে নিয়ে যাবেন। খালা চলে যাওয়ার পর ঘরটা নীরব হয়ে গেল — তবে এই নীরবতায় ঝিরির জলের শব্দ নেই, বাঁশপাতায় বাতাসের সুর নেই, দূরের গির্জার ঘণ্টা নেই। শুধু জানালার বাইরে থেমে না থাকা শহরের শব্দ।

ব্যাগ খুলে সবার আগে বের করল ছোট্ট বাইবেল, তার পাশে মায়ের দেওয়া ক্রুশটা রেখে কিছুক্ষণ চুপ বসে রইল। কাঠের বাক্সটা আজও খুলল না — কিছু স্মৃতি শুধু কাছে থাকলেই মানুষ শক্তি পায়।

বিকেলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ খুঁজতে লাগল সে। উঁচু ভবনের ফাঁকে এক ফালি নীল আকাশ দেখা যায় মাত্র। তার মনে হলো, পাহাড়ে আকাশ মানুষকে ঘিরে রাখে, শহরে মানুষ আকাশ খুঁজে বেড়ায়।

ঘরে থাকা অন্য তিনজন মেয়ে সন্ধ্যায় ফিরল, ক্লান্ত মুখে তবু নতুন মুখ দেখে হাসল। একজন বলল,

— ভয় পেয়ো না। প্রথম প্রথম আমাদেরও কষ্ট হতো। কয়েক দিন পর এই শহরের শব্দও তোমার পরিচিত হয়ে যাবে।

হৈমী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। দূরে সূর্য ডুবছে, লালচে আলো উঁচু ভবনের কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে। তার মনে হলো, এই একই সূর্য নিশ্চয়ই দেবাছড়া পাড়ার পাহাড়কেও ছুঁয়ে বিদায় নিচ্ছে, শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনেক দূরত্ব। সেই দূরত্ব পেরিয়েই আগামীকাল থেকে শুরু হবে তার নতুন জীবন — যার প্রথম দরজা খুলবে একটা বিউটি পার্লারের ভেতর।

দশম পর্ব: নীরবতার মূল্য

পরদিন ভোরেই হৈমীর ঘুম ভেঙে গেল, ঘড়ির অ্যালার্মে নয়, বহু বছরের অভ্যাসে। জানালার বাইরে আকাশ তখনও ফিকে, অথচ শহর অনেক আগেই জেগে উঠেছে — দূরে বাসের হর্ন, পানির মোটরের শব্দ, করিডরে পায়ের আওয়াজ। আজ তার জীবনের প্রথম কর্মদিবস।

সকাল নয়টার দিকে মার্গারেট খালা এসে পৌঁছালেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

— শহরে সময়ের দাম খুব বেশি। কাজ শেখা পরে, আগে সময়মতো পৌঁছাতে শেখ। আর কিছু বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করবি, লজ্জা পেলে শেখা যায় না।

পার্লারের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই হৈমী থমকে গেল — বড় বড় আয়না, সাজানো প্রসাধনসামগ্রী, শ্যাম্পু-হেয়ার কালার-নেইল পলিশের মিশ্র গন্ধ, যা সে আগে কখনো একসঙ্গে পায়নি। পার্লারের মালিক শারমিন আপা মৃদু হেসে বললেন,

— এখানে কেউ একদিনে কাজ শেখে না, ধৈর্য ধরে শিখতে হয়। সময়মতো আসা আর মনোযোগ দিয়ে শেখা — এই দুই অভ্যাস থাকলে বাকিটা সহজ হয়ে যায়।

প্রথম দিন তার হাতে কোনো মূল কাজ দেওয়া হলো না, শুধু দেখল — কোন তোয়ালে কোথায় থাকে, কোন যন্ত্র কোন কাজে লাগে, কীভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হয়। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন এক নতুন ভাষা শিখছে, যার অক্ষর নেই কিন্তু নিয়ম অনেক।

দুপুরের বিরতিতে এক তরুণী সহকর্মী জিজ্ঞেস করল,

— নতুন এসেছ? কোথা থেকে?

— বান্দরবানের দেবাছড়া পাড়া।

মেয়েটি হেসে বলল,

  • দেখেই বুঝতে পেরেছিলামতুমি পাহাড়ের। 

রাত সাড়ে আটটায় শেষ গ্রাহক বিদায় নেওয়ার পর গোছগাছ শেষে বেরিয়ে এল সবাই। ফেরার পথে মার্গারেট খালা বললেন,

— কাজ শিখতে সময় লাগে। কিন্তু মানুষ চিনতে আরও বেশি সময় লাগে।

হোস্টেলে ফিরে পায়ের পাতায় জমে থাকা ক্লান্তি নিয়ে বাইবেল পড়ে জানালার পাশে দাঁড়াল হৈমী। দূরের আকাশে মাত্র কয়েকটা তারা — পাহাড়ের আকাশের মতো অসংখ্য নয়, তবু সেই অল্প তারার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, আকাশ বদলেছে, শহর বদলেছে, জীবনও বদলে গেছে — শুধু প্রার্থনার ভাষাটা এখনও আগের মতোই আছে।

দিনগুলো ধীরে ধীরে একটা নির্দিষ্ট ছন্দে বাঁধা পড়তে শুরু করল — ভোরে ওঠা, তাড়াহুড়ো করে নাশতা, পার্লারে যাওয়া, রাতে ফেরা। মার্গারেট খালা ধীরে ধীরে তাকে ছোট ছোট দায়িত্ব দিতে লাগলেন — তোয়ালে ভাঁজ করা, শ্যাম্পুর বোতল সাজানো, যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা। একদিন শারমিন আপা বললেন,

— এখনো তুমি শিখছ। তাই কাজ দ্রুত করার চেষ্টা করো না, আগে ঠিকভাবে করতে শেখো। একই ভুল যেন দ্বিতীয়বার না হয়।

কথাগুলো সে ডায়েরিতে লিখে রাখল — ঢাকায় আসার পর তার প্রথম শিক্ষার নোট।

একদিন দুপুরে মার্গারেট খালা তাকে স্টোররুমে নিয়ে গিয়ে দেখালেন সারি সারি প্রসাধনসামগ্রী, বললেন শুধু নাম জানলেই হবে না, কোনটা কী কাজে লাগে তাও বুঝতে হবে। হৈমীর মনে হলো, পাহাড়ে যেমন সে গাছের পাতা দেখে গাছ চিনতে শিখেছিল, এখানেও তেমনি এক নতুন জগতের পরিচয় হচ্ছে — শুধু গাছের জায়গায় প্রসাধনসামগ্রী, ঝিরির শব্দের জায়গায় হেয়ার ড্রায়ারের শব্দ।

কয়েক সপ্তাহ পর সহকর্মীরা তাকে চিনতে শুরু করল শান্ত স্বভাবের এক মেয়ে হিসেবে। এক সকালে পার্লারে যাওয়ার পথে একটা কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হাসতে হাসতে ভেতরে ঢোকা একদল ছাত্রী দেখে তার পা অজান্তেই ধীরে হয়ে গেল — মনে পড়ল এসএসসির ফল পাওয়ার দিনটা, কলেজে ভর্তির স্বপ্ন। পরের মুহূর্তেই সে হাঁটা শুরু করল। সব স্বপ্ন সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয় না, কিছু স্বপ্ন মানুষ যত্ন করে বুকের ভেতর রেখে দেয়, সময়ের অপেক্ষায়।

একদিন এক গ্রাহকের ধাক্কায় কাচের বোতল ভেঙে গেলে হৈমী দ্রুত ভাঙা কাচ সরাতে গেলে শারমিন আপা থামিয়ে নিজে গ্লাভস পরে তুলে বললেন,

— সাহায্য করতে চাও, সেটা ভালো। কিন্তু নিরাপদ উপায়ে করতে শেখাটাও কাজের অংশ।

এক রাতে হোস্টেলে ফিরে লিজার কথা মনে পড়ল তার — হোস্টেলের ছোট্ট ঘর, রাতের গল্প, পরীক্ষার আগে একসাথে পড়া। বাইবেলের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “প্রভু, ওকেও ভালো রেখো।”

বর্ষার দিনগুলো একে একে পেরিয়ে যেতে লাগল। হৈমী বুঝতেই পারেনি, ঢাকায় আসার পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে। এখন পার্লারের অনেক কিছুই তার কাছে পরিচিত — কোন তাকে কী থাকে, কোন যন্ত্র কীভাবে পরিষ্কার করতে হয়। শারমিন আপা মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দেন,

— কাজ যত শিখবে, ততই সাবধান হবে। অভ্যাস যেন কখনও অসাবধানতা না হয়ে যায়।

একদিন মার্গারেট খালা তাকে প্রশিক্ষণ কক্ষে নিয়ে গিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও গুছিয়ে রাখার কাজ শেখালেন। হৈমীর হাত একটু কাঁপছিল, তবু ধৈর্য ধরে ঠিকভাবে করল। খালা হেসে বললেন,

— ভালো। তাড়াহুড়ো করোনি। কাজ শেখার শুরুটা এমনই হওয়া উচিত।

সেদিন সন্ধ্যায় শারমিন আপা বললেন,

— কাজ শেখার গতি ভালো। আগামী সপ্তাহ থেকে আরও কিছু দায়িত্ব দেব। তবে মনে রেখো, দায়িত্ব বাড়ার আগে দায়িত্ববোধ বাড়তে হয়।

দুপুরের বিরতিতে সহকর্মীদের সাথে চা খেতে খেতে একদিন হৈমী হেসে বলল,

— আমাদের পাহাড়ে চায়ে আদা একটু বেশি দেওয়া হয়। বৃষ্টি হলে সেই চায়ের স্বাদ আরও ভালো লাগে।

সপ্তাহের শেষে শারমিন আপা জানালেন, এই মাসের উপস্থিতি ও ট্রেইনি ভাতার হিসাব মেলানো হবে। কথাটা শুনে হৈমীর বুকের ভেতর দোলা দিয়ে উঠল — তার মনে হলো, নিজের পরিশ্রমেরও হয়তো একটা স্বীকৃতি আছে।

রবিবার প্রার্থনার পর মার্গারেট খালা বললেন,

— অনেকদিন বাড়িতে খবর দাওনি। আজ চিঠি লিখে দিতে পারো, আগামী সপ্তাহে পরিচিত একজন বান্দরবানে যাবে।

হৈমীর মুখে আলো ফুটে উঠল। সেই রাতে স্মৃতির কাঠের বাক্সটা খুলে শুকিয়ে যাওয়া কমলার ডাঁটি, পুরনো ফিতা আর ভাঁজ করা চিঠিটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে আবার রেখে দিল, না খুলেই। তারপর ডায়েরিতে লিখল — “আজ বুঝলাম, ছোট ছোট দায়িত্বও মানুষকে বদলে দেয়। কেউ দেখে না, তবু প্রতিদিন একটু একটু করে ভেতরে সাহস জন্মায়।”

বর্ষার শেষ ভাগে এক সন্ধ্যায় মাসের হিসাব মিটিয়ে শারমিন আপা ট্রেইনিদের হাতে খাম তুলে দিলেন। হৈমীর হাতেও একটা খাম এল।

— এটা তোমার এই মাসের ট্রেইনি ভাতা। মন দিয়ে কাজ শিখছ। এভাবেই এগিয়ে যেও।

গলা শুকিয়ে এল হৈমীর, শুধু বলল, “ধন্যবাদ, আপা।” বাড়ি ফেরার পথটুকু অন্যরকম লাগছিল — মনে হচ্ছিল ব্যাগের ভেতর শুধু কিছু টাকা নয়, নিজের পরিশ্রমের প্রথম স্বীকৃতিও রাখা আছে।

রাতে খাম খুলে টাকাগুলো হাতে নিয়ে তার মনে পড়ল, বাসে ওঠার আগে বাবা যে টাকা দিয়ে বলেছিলেন, “এটা একজন বাবার আশীর্বাদ” — সেদিন বাবার হাতে ছিল দেওয়ার আনন্দ, আজ তার নিজের হাতে আছে উপার্জনের আনন্দ।

পরদিন রবিবার প্রার্থনা শেষে মার্গারেট খালা জিজ্ঞেস করলেন চিঠি লেখা হয়েছে কিনা, টাকা পাঠাবে কিনা। হৈমী বলল,

— একটু পাঠাব, বাকিটা নিজের প্রয়োজনের জন্য রেখে দেব।

খালা সন্তুষ্ট চোখে বললেন,

— এটাই ঠিক। নিজের যত্ন নিতে না পারলে অন্যের দায়িত্বও ঠিকমতো নেওয়া যায় না।

দুপুরে চিঠিটা আরেকবার পড়ে দেখল সে —

প্রিয় বাবা ও মা, প্রভুর কৃপায় আমি ভালো আছি। এই মাসে প্রথমবার কিছু টাকা পেলাম, তার থেকে সামান্য কিছু পাঠালাম। ছোটদের পড়াশোনার দরকারে লাগলে খরচ করো। আমার জন্য দুশ্চিন্তা কোরো না, কাজ শিখছি ধীরে ধীরে। মা, শরীরের খেয়াল রাখবে। বাবা, বেশি কষ্ট কোরো না। সবাইকে ভালোবাসা দিও। তোমাদের হৈমী।

পরিচিত এক চার্চকর্মীর মাধ্যমে খামটা বান্দরবানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। খামটা পরিচিত লোকটির হাতে তুলে দেওয়ার পর অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করল হৈমী, যেন হৃদয়ের একটা ছোট্ট অংশও সেই খামের সঙ্গে পাহাড়ের পথে রওনা হয়েছে।

সেই রাতে হোস্টেলের ছাদে উঠে দাঁড়াল সে। বৃষ্টি থেমে গেছে, ভেজা বাতাসে শহরের আলো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। তার মনে হলো, এই একই আকাশের নিচেই দেবাছড়া পাড়া আছে — হয়তো এই মুহূর্তে মা উঠোনে কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছেন, বাবা জুম নিয়ে ভাবছেন, ছোটরা বই খুলে বসেছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— প্রভু, আমার চিঠিটা যেন নিরাপদে পৌঁছে যায়।

তারপর ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে। এখন আর শুধু নিজের জন্য বাঁচার দিন নয় — এখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা পরিবার, একটা পাহাড়ি বাড়ি, আর বহুদূরে অপেক্ষা করে থাকা কয়েকটা প্রিয় মুখ।

একাদশ পর্ব: শূন্যতার মধ্যে বেঁচে থাকা

অজান্তেই কয়েকটা বছর পেরিয়ে গেল। ঢাকার ভিড়ে মানুষ হারিয়ে যায় না, বরং ধীরে ধীরে ভিড়েরই একজন হয়ে যায়। হৈমীর জীবনও তেমনই এক ছন্দে বাঁধা পড়ল — সেন্ট অ্যানস উইমেন্স হোস্টেলের ছোট্ট ঘর, ভোরের ব্যস্ততা, সারাদিনের কাজ, রাতের ক্লান্তি।

শারমিন আপার পার্লারে এখন সে নতুন কর্মী নয়। নতুন মেয়েরা যোগ দিলে ধৈর্য নিয়ে তাদের কাজ শেখায়। সময়ের সাথে পরিবারের দায়িত্বও বেড়েছে — ছোট ভাই কলেজে, বোনের মাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে, জুমের ফলন কোনো বছর ভালো কোনো বছর খারাপ, কখনো বাবার ওষুধ, কখনো বাড়ির জরুরি প্রয়োজন। বেতন হাতে পেয়েই হৈমী খাতা খুলে বসে — প্রথমে বাড়িতে পাঠানোর টাকা, তারপর হোস্টেলের ভাড়া, খাবারদাবার, প্রয়োজনীয় খরচ, সবশেষে কিছুই আর সঞ্চয় থাকে না। প্রায়ই মনে হতো, এই খাতায় সবার জন্য আলাদা পাতা আছে, শুধু নিজের জন্য নেই।

পরিবারের বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে সপ্তাহে তিন রাত পার্লারের কাজ শেষে কাছের একটা ছোট কফি শপে কয়েক ঘণ্টা কাজ শুরু করল সে। মার্গারেট খালা একদিন বলেছিলেন,

— শরীরেরও তো একটা অধিকার আছে, মা।

হৈমী হেসে বলেছিল,

— জানি খালা। কিন্তু এই কয়েকটা রাতের উপার্জনেই তো কোন না কোন কিছুর অবলম্বন হয়। 

এক রাতে কফিশপ থেকে ফেরার পথে একটা কলেজের ফটকের সামনে থমকে দাঁড়াল সে। কলেজে ভর্তির বিজ্ঞপ্তির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হাঁটা শুরু করল। পরদিন রাতে একটা কাগজে ভর্তি ফি, বইয়ের দাম, যাতায়াতের হিসাব লিখল, তার পাশে লিখল ভাইয়ের কলেজের বেতন, বোনের পরীক্ষার ফি, বাবার ওষুধ। দুটো হিসাব পাশাপাশি রেখে শেষে কাগজটা ভাঁজ করে ডায়েরিতে রেখে দিল। সেদিন শুধু লিখেছিল — “প্রভু, আমার স্বপ্নটাকে ক্ষমা করে দিও। আজও তাকে অপেক্ষা করতে বললাম।”

কয়েক সপ্তাহ পর বাবার চিঠি এল, শেষে লেখা — “চার্চের পরিচিত একটা পরিবার তোমার কথা জানতে চেয়েছিল। তোমার মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”

মার্গারেট খালা জিজ্ঞেস করলেন,

— বাড়ি থেকে কী লিখেছে?

— বিয়ের কথা।

— তুমি কী ভাবছ?

— সংসার করার ইচ্ছে আমারও আছে, খালা। কিন্তু এখন থেমে গেলে ছোটদের পথও থেমে যাবে।

মার্গারেট খালা হাতের ওপর হাত রেখে বললেন,

— সব সময় জীবন আমাদের ইচ্ছেমতো চলে না, মা। তবে কোনো ত্যাগই বৃথা যায় না।

সেই পরিবারের সঙ্গে কয়েক দফা কথা হলো। ছেলেটি শিক্ষিত, শান্ত স্বভাবের। কিন্তু আলোচনার এক পর্যায়ে তারা জানাল, বিয়ের পর হৈমী পাহাড়ে ফিরে আসুক, এটাই তাদের প্রত্যাশা। কয়েক রাত ঘুমাতে না পেরে শেষে হৈমী নিজেই বাবাকে লিখল — “যদি তারা কষ্ট না পায়, এই সম্বন্ধ আর এগিয়ো না। ছোটদের পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি ঢাকাই থাকব।” কয়েক সপ্তাহ পর বিষয়টা নীরবে শেষ হয়ে গেল। কেউ কাউকে দোষ দিল না, তবু সবাই বুঝেছিল একটা সম্ভাবনা নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে চলে গেল।

সেই বড়দিনে লিজার সাথে দেখা হলে বলেছিল,

— তুই এখনও আগের মতোই সবকিছু নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখিস।

হৈমী হেসেছিল, উত্তর দেয়নি। কিছু নীরবতার ভাষা শুধু পুরনো বন্ধুরাই বোঝে।

দেবাছড়া থেকে আসা চিঠির ভাষাও বদলে যেতে লাগল। আগে থাকত “তুই কেমন আছিস”, এখন বেশি থাকে “তোর পাঠানো টাকায় ছোটটার ভর্তি হয়ে গেল,” “বাবার ওষুধ কিনেছি।” বাবার হাতের লেখাও কেঁপে যেত মাঝেমধ্যে। মা একবার লিখেছিলেন, “তোর বাবার হাঁটুর ব্যথাটা শীতে বেড়ে যায়। তবে তোকে কিছু না লিখতে বলে।” চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হৈমী, বুকের ভেতর একটা ভার জমে রইল।

একদিন পার্লারে নতুন এক মেয়ে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল,

— দিদি, বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দেয় না?

— দেয়।

— তাহলে?

— সময় হয়ে ওঠেনি।

কথাটা নিজের কানেই অনেকক্ষণ বাজতে থাকল তার — সময় হয়ে ওঠেনি, নাকি সময় নীরবে পেরিয়ে যাচ্ছে?

সেই বছর বড়দিনে বাড়ি যাওয়া হলো না, কাজের চাপে। সন্ধ্যায় প্রার্থনা শেষে হোস্টেলে ফিরতে মার্গারেট খালা একটা খাম দিলেন — ছোট বোনের চিঠি। “দিদি, আমার পরীক্ষার ফল ভালো হয়েছে, বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারব। তুমি না থাকলে এত দূর আসতে পারতাম না।” শেষে ছোট্ট করে লেখা — “দিদি, তুমিও ভালো থেকো।” এতদিন সে সবাইকে লিখেছে “আমি ভালো আছি”, আজ প্রথমবার কেউ তাকে লিখল “তুমিও ভালো থেকো।”

সেই রাতে পুরনো ট্রাঙ্ক খুলে স্কুলের সনদ, নীল ফিতা, পুরনো চিঠি আর সেই কলেজভর্তির হিসাবের কাগজটা আবার দেখল। তারপর ভাঁজ করে রেখে দিল। সব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য জন্মায় না; কিছু স্বপ্ন শুধু পথ দেখিয়েই থেমে যায়।। ডায়েরিতে লিখল — “অন্যের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখার আনন্দ আছে। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেও নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন একদিন নিঃশব্দে ফিরে এসে পাশে বসে।”

জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে খেয়াল করল, বয়স এখন সাতাশ। ফিসফিস করে বলল, “প্রভু, আমার শক্তিটুকু যেন শেষ না হয়ে যায়। সামনে পথ এখনও অনেক বাকি।”

আটাশে পা দেওয়ার পর বাবা-মায়ের চিঠিতে বিয়ের কথা বারবার ফিরে আসতে লাগল। মা লিখেছিলেন — “মা, তোর বয়স বাড়ছে। শুধু চাই তোরও যেন একটা সংসার হয়।” পড়ে অনেকক্ষণ চুপ বসেছিল হৈমী। তারও তো ইচ্ছে ছিল — ছোট্ট একটা ঘর, দিনশেষে দুকাপ চা, কারো সাথে গল্প ভাগ করে নেওয়া। শুধু বারবার একটু পরে সরিয়ে রেখেছিল।

চার্চের পরিচিতির মাধ্যমে আরেকটা সম্বন্ধ এল। ছেলেটি শিক্ষিত, ভদ্র। কিন্তু তখন ছোট ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, খরচ বেড়েছে অনেক। মার্গারেট খালাকে বলেছিল,

— খালা, আর দুই বছর যদি অপেক্ষা করা যেত!

খালা বলেছিলেন,

— অপেক্ষা করতে চাইলে করো। তবে মনে রেখো, অপেক্ষাও সবসময় মানুষকে অপেক্ষায় রাখে না।

বাবাকে লিখেছিল সময় চাইতে। কিন্তু কয়েক মাস পর খবর এল, ছেলেটির বিয়ে অন্যত্র ঠিক হয়ে গেছে। কারো ওপর অভিমান হলো না তার, শুধু মনে হলো কিছু পথ দেরি করলে আর খোলা থাকে না।

সেই রাতে ডায়েরিতে লিখল — “আজ বুঝলাম, সব হারানো কোনো মানুষের কারণে হয় না। কিছু হারানো শুধু সময়ের কারণে হয়।” জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল বাবার পুরনো কথা — “প্রভু কখনও মানুষের প্রার্থনা ভুলে যান না, শুধু তাঁর উত্তর সবসময় আমাদের সময়ে আসে না।” সে বুঝে গেল, অপেক্ষারও একটা শেষ আছে, আর সেই শেষটুকুই মানুষকে বদলে দেয় সবচেয়ে বেশি।

দ্বাদশ পর্ব : ফিরে আসার ডাক

ঢাকার সকালগুলো কখনো পুরোপুরি নীরব হয় না। ভোরের আলো ফোটার আগেই কোথাও রিকশার ঘণ্টা, কোথাও সবজিওয়ালার হাঁক, কোথাও দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর—সব মিলিয়ে শহরটা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।

বাড্ডার একটি পুরোনো তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার বারান্দার শেষ মাথায় ছোট্ট একটি সাবলেট ঘরে থাকে হৈমী।

ঘর বলতে খুব বেশি কিছু নয়। একটি কাঠের খাট, ছোট্ট আলমারি, পড়ার টেবিল, কয়েকটি বই, একটি পুরোনো ডায়েরি আর টেবিলের কোণে রাখা ছোট্ট কাঠের একটি ক্রুশ। দেয়ালে টাঙানো একটি ফ্রেমে পাহাড়ের ছবি। ছবিটা খুব সাধারণ, তবু প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে আলো নিভিয়ে শোয়ার আগে অজান্তেই একবার তাকায় সে।

হয়তো মানুষ যত দূরেই চলে যাক, নিজের জন্মভূমিকে কখনো পুরোপুরি পেছনে ফেলে যেতে পারে না।

এই বাড়ির মালিক একজন বয়স্ক খ্রিস্টান ভদ্রমহিলা। সবাই তাঁকে দিদি বলেই ডাকে। স্বামীকে বহু বছর আগে হারিয়েছেন। সন্তানরাও নিজেদের সংসারে ব্যস্ত। প্রথমদিকে ভাড়াটে আর বাড়িওয়ালার সম্পর্ক থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দূরত্ব অনেকটাই কমে গেছে।

বড়দিন এলে দুজনে মিলে কেক বানান। গুড ফ্রাইডেতে একসঙ্গে গির্জায় যান। কোনো দিন হৈমীর অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে দিদি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। আবার দিদির শরীর খারাপ হলে ওষুধ এনে দেওয়া থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া—সবকিছুই নীরবে সামলে নেয় হৈমী।

জীবনের কিছু সম্পর্কের কোনো নাম থাকে না। অথচ সেই সম্পর্কই একসময় আপনজনের মতো হয়ে ওঠে।

হোস্টেল ছেড়েছে বহু বছর হলো।

এরপর থেকে এই ছোট্ট ঘরটিই তার ঠিকানা।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকাল আটটার কিছু আগে বেরিয়ে পড়ল সে। বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলো একে একে খুলছে। অফিসগামী মানুষের ভিড় বাড়ছে। শহর তার চিরচেনা ব্যস্ততায় ঢুকে পড়ছে।

ঢাকার একটি পরিচিত কফি হাউসে প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছে হৈমী।

শুরুর দিকে ছিল সাধারণ কর্মী। ধীরে ধীরে নিজের সততা, ধৈর্য আর দায়িত্ববোধ দিয়ে সবার আস্থা অর্জন করেছে। এখন ক্যাশ কাউন্টার, দিনের হিসাব, বিক্রির রেকর্ড, নতুন কর্মীদের কাজ শেখানো—অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বই তার ওপর।

মালিক প্রায়ই অন্য কর্মীদের উদ্দেশে বলেন,

— “হৈমীর মতো মন দিয়ে কাজ করতে শিখো।”

কথাটা শুনলে হৈমী শুধু মৃদু হেসে নিজের কাজে মন দেয়। প্রশংসা শুনতে তার কখনোই ভালো লাগে না।

সহকর্মীরা অবশ্য অন্যভাবেই দেখে তাকে।

সবার মুখে তার একটাই নাম—হৈমীদি।

কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে প্রথমে তার কাছেই আসে। নতুন কর্মীরা ভুল করলে সে ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে দেয়। কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে না।

হয়তো দীর্ঘ সংগ্রাম মানুষকে এমনই শান্ত করে দেয়।

দুপুরের ব্যস্ততা একটু কমতেই মোবাইল ফোনটা কেঁপে উঠল।

ছোট ভাই।

হৈমী কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভাতিজা আর ভাতিজির হাসির শব্দ ভেসে এল।

— “পিসি… পিসি…”

শিশুদের উচ্ছ্বাস শুনে নিজের অজান্তেই হেসে উঠল সে।

ভিডিও কলে একে একে সবার মুখ দেখা গেল। বড় ভাই, ভাবি, ছোট ভাই, ছোট ভাবি—সবাই যেন একসঙ্গে কথা বলতে চাইছে।

কিছুক্ষণ পর ছোট ভাই একটু গম্ভীর গলায় বলল,

— দিদি, একটা কথা অনেকদিন ধরেই বলতে চাচ্ছিলাম।

— বল।

— এখন থেকে আর আমাদের জন্য টাকা জমিয়ে রাখিস না।

হৈমী কিছু বলল না।

ওপাশ থেকে ভাই আবার বলল,

— প্রভুর আশীর্বাদে আমরা দুই ভাইই এখন নিজেদের সংসার চালাতে পারছি। তুই এত বছর যা করেছিস, সেটা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। এবার নিজের জন্য একটু ভাব।

কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু সেই সাধারণ কথাই যেন অদৃশ্য কোনো দরজায় নীরবে কড়া নাড়ল।

অনেক বছর ধরে প্রতি মাসের শেষে তার একটা নির্দিষ্ট কাজ ছিল—বাড়িতে টাকা পাঠানো। কখনো ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা। কখনো বড় ভাইয়ের সংসারের টানাপোড়েন। কখনো বাবার চিকিৎসা। কখনো মায়ের ওষুধ। কখনো ছোট বোনের প্রয়োজন। একটা দায়িত্ব শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা এসে দাঁড়াত।

আজ প্রথমবার তার মনে হলো, সেই দীর্ঘ পথটা বুঝি সত্যিই শেষের দিকে এসে পৌঁছেছে।

জীবনের এতগুলো বছর সে অন্যদের পথ মসৃণ করতে করতেই হেঁটেছে।

নিজের জন্য কোনো পথ কি কখনো ভেবেছিল?

প্রশ্নটা মনে উঠল।

উত্তর এল না।

ঠিক তখনই একজন সহকর্মী এগিয়ে এসে বলল,

— হৈমীদি, তিন নম্বর টেবিলের বিলটা একটু দেখবেন?

হৈমী ফোনটা ব্যাগে রেখে আবার কাজে ফিরে গেল।

জীবন কখনো মানুষকে খুব বেশি সময় ভাবার সুযোগ দেয় না।

কথাটা বলে সহকর্মী আবার নিজের কাজে ফিরে গেল।

হৈমী কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বিলটা মিলিয়ে দিল। কফি মেশিনের অবিরাম শব্দ, কাপ-পিরিচের টুংটাং, গ্রাহকদের কথোপকথন—সব মিলিয়ে কফি হাউস আবার আগের মতোই ব্যস্ত হয়ে উঠল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। জানালার কাচে পড়া রোদের রং ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। অফিস ছুটির সময় যত এগিয়ে এল, ততই বাড়তে শুরু করল মানুষের ভিড়। কেউ সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প করতে এসেছে, কেউ ল্যাপটপ খুলে নীরবে কাজ করছে, আবার কেউ এক কাপ কফির আড়ালে দীর্ঘ আলাপ জমিয়েছে।

হৈমীর দিনগুলো প্রায় একই ছন্দে কাটে।

তবু প্রতিটি দিন একরকম নয়।

কিছু কিছু দিন অজান্তেই মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সেদিনও বিকেলের ব্যস্ততা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।

একজন কর্মী নতুন করে যোগ দিয়েছে। ক্যাশ মেশিনে একটি বিলের এন্ট্রি করতে গিয়ে ভুল করে বসেছিল। হৈমী ধৈর্য নিয়ে ভুলটা বুঝিয়ে দিল।

— এভাবে দিলে হিসাবের সঙ্গে মিলবে না। আগে বিল নম্বরটা মিলিয়ে নাও, তারপর এন্ট্রি করবে।

ছেলেটি লজ্জিত মুখে মাথা নাড়ল।

— জি, হৈমীদি।

হৈমী হালকা হেসে আবার কাউন্টারের দিকে মন দিল।

ঠিক তখনই কফি হাউসের কাঁচের দরজার ওপরে ঝোলানো ঘণ্টাটি টুং করে বেজে উঠল।

তিনজন ভদ্রলোক ভেতরে প্রবেশ করলেন।

তাদের মধ্যে একজনের বয়স পঞ্চাশের কিছু বেশি হবে। পরিপাটি পোশাক, ছাঁটা দাড়ি, শান্ত মুখ। চারপাশে একবার তাকিয়ে তিনি জানালার পাশের একটি টেবিলে গিয়ে বসলেন। বাকি দুজনও তাঁর সঙ্গে বসলেন।

একজন ওয়েটার এগিয়ে গিয়ে অর্ডার নিয়ে এল।

হৈমী তখন অন্য এক গ্রাহকের বিল নিচ্ছিল।

কাজের ফাঁকে একবার চোখ তুলে তাকিয়েই আবার নিচু হয়ে গেল।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে কয়েক মুহূর্ত পর আবারও তার দৃষ্টি সেদিকেই ফিরে গেল।

মুখটা যেন কোথাও দেখা।

খুব পরিচিত।

তবু মনে করতে পারছিল না।

সে নিজের মনকে বোঝাল, এ তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এত মানুষের শহরে অনেক মুখই একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায়।

তবু অস্বস্তিটা কাটল না।

কিছুক্ষণ পর ওয়েটার কফির ট্রে নিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।

ভদ্রলোকদের হাসির শব্দ ভেসে এল।

সেই হাসিটুকুও যেন কোথাও শুনেছে সে।

হৈমী এবার নিজেকেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করল—

কোথায়?

মনে করার চেষ্টা করল।

কোনো উত্তর পেল না।

সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল।

কফি হাউসের ভিড় আরও বেড়ে গেল। একের পর এক অর্ডার, বিল, কার্ড পেমেন্ট—সব মিলিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে সেই মুখটাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে।

রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে ভিড় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল।

ওয়েটার এসে বলল,

— হৈমীদি, সাত নম্বর টেবিলের বিল।

হৈমী বিল প্রিন্ট করে কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল।

কয়েক মুহূর্ত পর তিনজন ভদ্রলোক উঠে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে এলেন।

সামনাসামনি দাঁড়াতেই আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা ফিরে এল।

লোকটি ওয়ালেট থেকে একটি ব্যাংক কার্ড বের করে বাড়িয়ে দিলেন।

হৈমী কার্ডটি নিয়ে পেমেন্ট মেশিনে বসাল।

লেনদেন সম্পন্ন হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।

রসিদটি হাতে নিয়ে বাড়িয়ে দিতে গিয়েও সে থেমে গেল।

মনের ভেতরে যেন বহুদিনের ঘুমিয়ে থাকা একটি স্মৃতি নড়েচড়ে উঠছে।

এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে ভদ্রভাবে বলল,

— মাফ করবেন… একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?

ভদ্রলোক বিস্মিত হলেও আন্তরিক হাসি নিয়ে বললেন,

— জি, বলুন।

হৈমী একটু ইতস্তত করল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

— আপনি কি… অনেক বছর আগে বড়দিনের আগের দিন বান্দরবানের একটি পাহাড়ি গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন?

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন।

মনে হলো, প্রশ্নটি তাঁকে বহু বছরের পুরোনো কোনো স্মৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

তিনি ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— হ্যাঁ… কয়েকজন বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম।

হৈমীর বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

সে শান্ত গলায় বলল,

— সেদিন আপনাদের এক রাত থাকার কথা ছিল। কিন্তু বড়দিনের উৎসব দেখবেন বলে পরদিনও থেকে গিয়েছিলেন…

কথা শেষ হতে না হতেই ভদ্রলোকের চোখে বিস্ময়ের আলো ফুটে উঠল।

— হ্যাঁ… ঠিক তাই! আমরা আগে কখনো পাহাড়ের বড়দিন দেখিনি। তাই পরিকল্পনা বদলে আরও একদিন থেকে গিয়েছিলাম।

তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।

মনে হলো, একের পর এক পুরোনো দৃশ্য তাঁর মনে ফিরে আসছে—ছোট্ট গির্জা, পাহাড়ি ক্যারলের সুর, শীতের রাত, আর এক অতিথিপরায়ণ পরিবার।

তিনি গভীরভাবে হৈমীর দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

— আপনি… তাহলে কি সেই বাড়ির বড় মেয়ে?

হৈমীর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

— জি। আমি হৈমী।

ভদ্রলোক কয়েক মুহূর্ত যেন কথা খুঁজে পেলেন না।

চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিণত, সংযত এই নারী আর বারো বছর আগের সেই পাহাড়ি তরুণীকে একসঙ্গে মিলিয়ে নিতে তাঁর একটু সময় লাগছিল।

তারপর ধীরে ধীরে তাঁর মুখে বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে একরাশ উষ্ণ হাসি ফুটে উঠল।

— সত্যিই অবিশ্বাস্য…!

হৈমী মৃদু হেসে বলল,

— আমিও প্রথমে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। অনেকক্ষণ ধরে মনে করার চেষ্টা করছিলাম। শেষে আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।

ভদ্রলোক হালকা মাথা নাড়লেন।

— আপনি প্রশ্নটা না করলে হয়তো আমিও মনে করতে পারতাম না। কিন্তু বড়দিনের কথা বলতেই সব যেন একসঙ্গে মনে পড়ে গেল।

তিনি একটু থেমে আবার বললেন,

— আপনাদের গ্রামের সেই ছোট্ট গির্জাটা… রাতভর ক্যারল… আপনার বাবার আন্তরিকতা… আপনার মায়ের রান্না… এখনও ভুলিনি।

হৈমীর চোখের কোণে অচেনা এক কোমলতা নেমে এল।

এত বছর পরও কেউ তার বাবা-মাকে এভাবে মনে রেখেছে—এটুকুই যেন তাকে নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেল।

ঠিক তখনই পাশ থেকে একজন সহকর্মী এগিয়ে এসে বলল,

— হৈমীদি, নতুন দুটো বিল এসেছে।

হৈমী ফিরে তাকিয়ে বলল,

— এক মিনিট, আসছি।

ভদ্রলোক নিজেই বললেন,

— আপনাকে আর ব্যস্ত রাখব না।

এরপর সহকর্মীদের দিকে ফিরে মৃদু হেসে বললেন,

— অনেক বছর আগে আমরা বান্দরবানের এক পাহাড়ি গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওদের বাড়িতেই অতিথি ছিলাম। আজ এত বছর পরে হঠাৎ আবার দেখা হয়ে গেল। পৃথিবীটা সত্যিই ছোট।

তাঁর একজন সহকর্মী বিস্মিত হয়ে বললেন,

— এত বছর পরও চিনে ফেললেন?

ভদ্রলোক হেসে উত্তর দিলেন,

— মানুষকে হয়তো ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।

হৈমী আর কিছু বলল না।

কাউন্টারের দিকে ফিরে যাওয়ার আগে শুধু বিনীতভাবে মাথা নাড়ল।

ভদ্রলোকও একইভাবে হাসিমুখে বিদায় জানালেন।

কাঁচের দরজাটা খুলতেই ছোট্ট ঘণ্টাটি আবার মৃদু শব্দে বেজে উঠল।

তিনজন ধীরে ধীরে বাইরে চলে গেলেন।

হৈমী কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

কাঁচের ওপারে রাতের ব্যস্ত শহর। গাড়ির আলো একটার পর একটা সড়ক পেরিয়ে যাচ্ছে। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু তার ভেতরে যেন বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা আরেকটি দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল।

সে আবার কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল।

নতুন গ্রাহকের বিল নিল।

কার্ডের লেনদেন সম্পন্ন করল।

খুচরা টাকা গুনে ফিরিয়ে দিল।

সবকিছু আগের মতোই চলছিল।

তবু কিছুই আর আগের মতো লাগছিল না।

রাত বাড়তে থাকল।

শেষ দিকের গ্রাহকেরাও একে একে চলে যেতে শুরু করলেন।

ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে দশটা।

ওয়েটাররা টেবিল গুছিয়ে নিচ্ছে।

কফি মেশিনের শেষ কাপটিও ধুয়ে রাখা হয়েছে।

হৈমী দিনের সব হিসাব আরেকবার মিলিয়ে দেখল।

একটি একটি করে ক্যাশ গুনে রেজিস্টারে লিখে রাখল।

সবকিছু ঠিক আছে নিশ্চিত হয়ে ক্যাশবক্স বন্ধ করতেই মালিক এগিয়ে এলেন।

হিসাবের খাতা একবার দেখে সন্তুষ্ট গলায় বললেন,

— সব মিলেছে?

— জি, মিলেছে।

— আচ্ছা, তাহলে আজ বেরিয়ে পড়ো। কাল দেখা হবে।

— জি, আচ্ছা। শুভরাত্রি।

— শুভরাত্রি। সাবধানে যেও।

ব্যাগটা কাঁধে তুলে কফি হাউস থেকে বেরিয়ে এল হৈমী।

রাতের ঢাকার বাতাসে দিনের তুলনায় একটু শীতলতা।

বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনও অনেক কমে গেছে।

কিছুক্ষণ পর একটি বাস এলো।

জানালার পাশের আসন পেয়ে চুপচাপ বসে পড়ল সে।

বাস ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।

জানালার বাইরে শহরের আলো পিছিয়ে যাচ্ছে।

হৈমী ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন বের করল।

ছোট ভাই দুপুরে কয়েকটি ছবি পাঠিয়েছিল।

একটায় উঠোনে সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছে।

আরেকটায় বড় ভাইয়ের ছেলে বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করছে।

একটি ছবিতে মা হাসছেন।

অনেকদিন পর সেই হাসিটা এত কাছ থেকে দেখল সে।

অজান্তেই তার ঠোঁটেও একটি মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

আজকের দিনটা অদ্ভুত।

দুপুরে ভাইয়ের কথাগুলো…

তারপর বহু বছর পর সেই অচেনা-চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা…

তার মনে হচ্ছিল, জীবনের ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো সুতো যেন ধীরে ধীরে আবার এক অদৃশ্য গিঁটে এসে মিলতে শুরু করেছে।

ত্রয়োদশ পর্ব : ছবির বাইরে যে মুখ

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।

শেষ গ্রাহকটিও কফি হাউস থেকে বেরিয়ে যেতেই কাঁচের দরজাটা ধীরে বন্ধ করে দিল সিকিউরিটি গার্ড। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে কফির সুবাস, কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দ আর মানুষের কথাবার্তায় মুখর ছিল পুরো জায়গাটা, সেখানে এখন নেমে এসেছে দিনের শেষের পরিচিত নীরবতা।

হৈমী কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে দিনের হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছিল।

ক্যাশ ড্রয়ারের নোটগুলো মূল্য অনুযায়ী আলাদা করে গুছিয়ে রাখল। কয়েনগুলো ট্রেতে সাজিয়ে রাখল। তারপর কম্পিউটারের পর্দায় বিক্রির হিসাবের সঙ্গে ক্যাশের অঙ্ক আরেকবার মিলিয়ে দেখল।

সব ঠিক।

তবু অভ্যাসবশত আবারও চোখ বুলিয়ে নিল।

দীর্ঘ কর্মজীবনে সে একটি জিনিস খুব ভালো করেই শিখেছে—বিশ্বাস অর্জন করতে অনেক সময় লাগে, কিন্তু সামান্য অসাবধানতাই সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়ে দিতে পারে।

এমন সময় রুবেল এসে বলল,

— “হৈমীদি, আমি কফি মেশিনটা বন্ধ করে দিচ্ছি।”

— “দাও। পানি লাইনটাও একবার দেখে নিও।”

— “আচ্ছা।”

রুবেল ভেতরের দিকে চলে যেতেই আরেকজন কর্মী একটু ইতস্তত করে এগিয়ে এল।

— “হৈমীদি, কাল আমি একটু দেরি করে আসব। সকালে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে হবে।”

হৈমী খাতা থেকে মুখ না তুলেই বলল,

— “আগে থেকে বলেছ, সেটাই ভালো হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি পারো চলে এসো।”

— “জি, চেষ্টা করব।”

ছেলেটা চলে গেলে হৈমী খাতাটা বন্ধ করল।

কবে যে নতুন কর্মী থেকে ধীরে ধীরে সবার ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছে, সেটা সে নিজেও টের পায়নি। এখন কোনো সমস্যায় পড়লে ছেলেমেয়েগুলো প্রথমেই এসে বলে, “হৈমীদি…”

ঠিক তখনই মালিক অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন।

— “হৈমী, হিসাব শেষ?”

— “জি, স্যার।”

— “ক্যাশটা লক করে চাবিটা সিকিউরিটি ডেস্কে দিয়ে যেও। আমি বের হচ্ছি।”

— “ঠিক আছে, স্যার। শুভরাত্রি।”

— “শুভরাত্রি।”

মালিক বেরিয়ে যেতেই কফি হাউসের ভেতরের আরও কয়েকটি আলো নিভে গেল।

হৈমী ক্যাশ লক করে নির্দিষ্ট খামে দিনের কাগজপত্র গুছিয়ে রাখল। সবশেষে চাবিটা সিকিউরিটি ডেস্কে বুঝিয়ে দিয়ে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

ঢাকার রাত তখনও জেগে আছে।

দূরের ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। ফুটপাতের চায়ের দোকানে কয়েকজন রিকশাচালক শেষ কাপ চা হাতে নিয়ে দিনের গল্প করছে। কোথাও ভাজা বাদামের গন্ধ, কোথাও গরম পরোটার ধোঁয়া। শহর যেন কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।

হৈমী ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।

প্রতিদিনের পথ, প্রতিদিনের মতোই।

তবু আজকের রাতটা যেন অদ্ভুতভাবে অন্য রকম।

কিছুদূর এগোতেই তার কানে আবার ভেসে এল সায়েমের কণ্ঠ—

“এক রাত থাকার কথা ছিল। কিন্তু পাহাড়ের বড়দিন দেখে আমরা আরেক দিন থেকে গিয়েছিলাম…”

হৈমী অজান্তেই হাঁটা ধীর করে দিল।

মাত্র দুটো দিন।

জীবনের হিসাবে খুবই অল্প সময়।

তবু সেই দুটো দিনের স্মৃতি বারো বছর পরও দুজন মানুষকে একে অপরের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।

তার মনে পড়ল গ্রামের সেই বড়দিনের ব্যস্ততা।

চার্চের ঘণ্টা।

মধ্যরাতের প্রার্থনা।

ক্যারলের সুর।

বাড়ি বাড়ি অতিথিদের আপ্যায়ন।

আর শহর থেকে আসা সেই কয়েকজন, যাদের চোখে ছিল নতুন কিছু দেখার আনন্দ।

হঠাৎ তার মনে হলো, পাহাড়ে মানুষ হয়তো অতিথিকে শুধু অতিথি বলে মনে রাখে না; নিজের মানুষের মতোই মনে রাখে।

এই শহরে প্রতিদিন কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।

কত মুখ আসে, কত মুখ হারিয়ে যায়।

পরদিনই তাদের অধিকাংশের কথা আর মনে থাকে না।

কিন্তু পাহাড়ের স্মৃতি যেন অন্যরকম।

সেখানে একসঙ্গে বসে একবেলা খাবার খাওয়া, আগুনের পাশে গল্প করা কিংবা উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—এসব সহজে মুছে যায় না।

কখন যে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি।

একটা বাস এসে থামল।

মানুষ নামল।

মানুষ উঠল।

হৈমীও ধীরে ধীরে বাসে উঠে জানালার পাশের একটি খালি আসনে বসে পড়ল।

বাস আবার চলতে শুরু করল।

হৈমী আলতো করে কপালটা ঠান্ডা কাঁচে ঠেকিয়ে দিল।

বাইরে তার চোখ, কিন্তু মন যেন অনেক দূরে।

কুয়াশায় মোড়া একটা পাহাড়ি সকাল…

দূরে চার্চের ঘণ্টাধ্বনি…

আর উঠোন জুড়ে ব্যস্ত হয়ে ছুটে বেড়ানো এক তরুণী, যার তখনও ধারণা ছিল না—একদিন সেই পাহাড় ছেড়ে তাকে বহু দূরের এক শহরে নিজের জীবন গড়তে হবে।

বাস এগিয়ে চলল।

আর বহুদিন ধরে নীরব হয়ে থাকা স্মৃতিগুলোও যেন ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, আবার জেগে উঠতে শুরু করল।

বাসের ভেতরটা খুব একটা ভিড় ছিল না।

দিনের ব্যস্ততা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ক্লান্ত মুখের কয়েকজন অফিসফেরত মানুষ, দু-একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর জানালার পাশে মাথা হেলিয়ে ঘুমিয়ে পড়া এক বৃদ্ধ—সব মিলিয়ে এক ধরনের নীরবতা।

হৈমী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

ঢাকার রাতের আলো একটার পর একটা পিছিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু তার ভেতরে যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা কিছু স্মৃতি।

আজ কত বছর পর এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, যে তার অতীতের একটা ছোট্ট অধ্যায়ও ভুলে যায়নি।

এক রাত থাকার কথা ছিল।

শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের বড়দিন দেখে আরও একদিন থেকে গিয়েছিলেন।

এতটুকু ঘটনাও মানুষ মনে রাখতে পারে!

হৈমীর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল।

বাসটা একটা মোড় ঘুরতেই রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা গির্জার চূড়া চোখে পড়ল।

আলো-আঁধারির মধ্যেও ক্রুশচিহ্নটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

শেষ কবে নিজের গ্রামের চার্চে বড়দিনের প্রার্থনায় দাঁড়িয়েছিল, ঠিক মনে পড়ল না।

প্রথম দিকে প্রতি বছরই যাওয়ার চেষ্টা করত।

তারপর একের পর এক দায়িত্ব এসে দাঁড়াল।

কখনো ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ, কখনো ছোট বোনের বিয়ে, কখনো বাবার চিকিৎসা, কখনো সংসারের অন্য প্রয়োজন।

প্রতিবারই মনে হয়েছে—

“এই বছর না হয় গেল না। আগামী বছর নিশ্চয়ই যাব।”

কিন্তু সেই আগামী বছরগুলোও একসময় নীরবে পেরিয়ে গেছে।

বাসের কাঁচে নিজের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা প্রশ্ন এসে দাঁড়াল তার ভেতরে—

এত বছর পরে যদি একবার ফিরে যাই… দেবাছড়া পাড়া কি এখনও আমাকে চিনতে পারবে?

প্রশ্নটার কোনো উত্তর সে খুঁজল না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

কন্ডাক্টরের ডাক তাকে আবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।

— “বাড্ডা… বাড্ডা…”

হৈমী ধীরে ধীরে বাস থেকে নেমে এল।

বড় রাস্তার কোলাহল পেছনে ফেলে গলির ভেতর ঢুকতেই চারপাশ অনেকটা শান্ত হয়ে গেল।

গেট খুলতেই ভেতর থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

— “হৈমী, এলি?”

— “জি, দিদি।”

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দিদি মৃদু হেসে বললেন,

— “আজ বেশ দেরি হয়ে গেল দেখছি।”

— “হ্যাঁ, কাজ শেষ করতে একটু সময় লেগে গেল।”

দিদি কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর শান্ত স্বরে বললেন,

— “খাবার গরম আছে। খেয়ে নিস।”

— “আচ্ছা, দিদি।”

এর বেশি কোনো কথা হলো না।

এত বছরের পরিচয়ে তারা দুজনেই জানে—সব প্রশ্নের উত্তর মুখে বলতে হয় না।

নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল হৈমী।

ঘরটা আগের মতোই আছে।

তবু আজ যেন তার নিজের ভেতরেই কিছু বদলে গেছে।

অনেক দিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা স্মৃতির একটি জানালা আজ নিঃশব্দে খুলে গেছে।

আর সেই জানালার ওপারে ভেসে উঠছে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, চার্চের ঘণ্টাধ্বনি, আর বহু বছর আগে ফেলে আসা এক জীবনের মুখ।

সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

ঢাকার আকাশে আজ খুব বেশি তারা দেখা যায় না।

তবু অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে আবারও সেই প্রশ্নটা ফিরে এল—

“সত্যিই যদি একদিন ফিরে যাই…”

কোনো উত্তর এল না।

শুধু রাতটা যেন আগের চেয়ে একটু গভীর হয়ে উঠল।

রাতটা খুব একটা ভালো ঘুম হলো না।

বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল।

কখনো মনে হচ্ছিল, সে আবার দেবাছড়া পাড়ার সেই বাঁশের বাড়িতে শুয়ে আছে। দূরে চার্চের ঘণ্টা বাজছে। পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা নেমে এসেছে। বড়দিনের আগের রাতের সেই ব্যস্ততা, ক্যারলের সুর, মানুষের হাসিমুখ—সব যেন আবার ফিরে এসেছে।

চোখ খুলতেই বুঝল, না—সে ঢাকাতেই আছে।

জানালার ওপারে পাশের ভবনের কয়েকটি জানালায় তখনও আলো জ্বলছে।

ঘড়িতে রাত তিনটা।

হৈমী আবার চোখ বন্ধ করল।

কিন্তু স্মৃতিগুলো যেন আজ আর ঘুমোতে চাইছিল না।

ভোরে অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে গেল।

অনেক দিন পর নিজের ভেতরে অদ্ভুত এক হালকা অনুভূতি টের পেল।

কেন এমন লাগছে, সে নিজেও বুঝতে পারল না।

হয়তো গত সন্ধ্যার সেই আকস্মিক সাক্ষাৎ।

হয়তো আরও গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো অনুভূতি।

দিদি তখন রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন।

হৈমীকে দেখে মৃদু হেসে বললেন,

— আজ তো অ্যালার্ম বাজার আগেই উঠে পড়েছিস।

হৈমীও হেসে বলল,

— ঘুমটা ভেঙে গেল।

দিদি আর কিছু বললেন না।

দুজনেই জানতেন, কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ নিজেকেও সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারে না।

কফি হাউসে পৌঁছানোর পর দিনটা শুরু হলো অন্য দিনের মতোই।

সকালের ব্যস্ততা।

তারপর দুপুর।

অর্ডার, বিল, হিসাব, নতুন গ্রাহক—সবকিছু স্বাভাবিক ছন্দে এগিয়ে চলছিল।

তবু আজ কাজের ফাঁকে ফাঁকে মনটা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।

একজন গ্রাহক বিল পরিশোধ করে হেসে বললেন,

— ধন্যবাদ।

খুব সাধারণ একটি শব্দ।

তবু অকারণেই আগের সন্ধ্যার কথোপকথন মনে পড়ে গেল।

হৈমী নিজের মনেই হালকা বিরক্ত হলো।

এত বছর পরে আজই কেন বারবার এসব কথা মনে পড়ছে?

উত্তর মিলল না।

দুপুরের ভিড় একটু কমতেই মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এল।

মেজো বোন।

সঙ্গে কয়েকটি ছবি।

প্রথম ছবিতে উঠোনজুড়ে সবাই একসঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে।

পরের ছবিতে বাবা আর মা পাশাপাশি বসে হাসছেন।

আরেকটিতে দুই ভাই, তিন বোন, ভাতিজা, ভাতিজি, ভাগিনা আর ভাগ্নিদের হাসিতে পুরো উঠোন ভরে গেছে।

ছবির নিচে ছোট্ট একটি লেখা—

“আগামী মাসে সবাই একসঙ্গে বাড়ি আসার চেষ্টা করছি। তুই যদি আসতে পারিস, অনেক দিন পর পুরো পরিবারটা এক হবে।”

হৈমী ছবিগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ খেয়াল করল—

ছবির প্রতিটি মুখ তার আপন।

শুধু একজন নেই।

সে নিজে।

একসময় এমন কোনো পারিবারিক ছবি হতো না, যেখানে সে থাকত না।

আজ সে শুধু দূর থেকে সেই ছবিগুলো দেখছে।

অদ্ভুত এক শূন্যতা বুকের ভেতর নিঃশব্দে নেমে এল।

বিকেলের দিকে হিসাবের খাতা বন্ধ করতে গিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।

শহরের ওপর ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে।

হঠাৎ মনে পড়ল—

শেষ কবে বাবার সঙ্গে জুমের পথ ধরে হেঁটেছিল?

শেষ কবে ঝিরির ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়েছিল?

শেষ কবে বড়দিনের প্রার্থনায় নিজের গ্রামের চার্চে দাঁড়িয়েছিল?

মনে করতে পারল না।

সময় কি সত্যিই এত দ্রুত মানুষকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়?

নাকি মানুষই ব্যস্ততার অজুহাতে নিজের ভেতরের ডাককে শুনতে পায় না?

কাজ শেষ করে নিজের টেবিলে ফিরে এসে ব্যাগ থেকে ছোট্ট পুরোনো ডায়েরিটা বের করল।

ডায়েরির ভেতরে অনেক বছর ধরে রাখা একটি খাম।

খাম খুলতেই বেরিয়ে এল কয়েকটি পুরোনো ছবি।

মিশন স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা একটি ছবি।

বাবার হাতের লেখা একটি ছোট্ট চিঠি।

আর পাতার ভাঁজে চাপা পড়ে থাকা একটি শুকিয়ে যাওয়া পাহাড়ি গাছের পাতা।

পাতাটা খুব সাবধানে হাতে তুলে নিল সে।

রং হারিয়েছে অনেক আগেই।

তবু স্পর্শ করতেই মনে হলো—

ভেজা মাটির সেই পরিচিত গন্ধ এখনও কোথাও লুকিয়ে আছে।

হৈমী আস্তে করে পাতাটা আবার খামের ভেতরে রেখে দিল।

তার মনে হলো—

হয়তো মানুষ যত দূরেই চলে যাক, নিজের শিকড় কখনো তাকে ভুলে যায় না।

একসময় শুধু খুব নীরবে ফিরে আসার ডাক দেয়।

জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে।

কফি হাউসের কাঁচে শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।

হৈমী আবার কাজে মন দিল।

কিন্তু তার ভেতরে, খুব গভীরে, একটি নীরব বীজ ইতিমধ্যেই অঙ্কুরিত হয়েছে।

সে এখনও কাউকে কিছু বলেনি।

নিজেকেও না।

তবু সে বুঝতে পারছিল—

পাহাড় তাকে আর শুধু স্মৃতি দিয়ে ডাকছে না।

ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, নিজের কাছেই ফিরে যাওয়ার পথ দেখাতে শুরু করেছে।

চতুর্দশ পর্ব: শিকড়ের কথা

কয়েকটা দিন কেটে গেল। ঢাকার জীবন আবার তার চেনা ছন্দে ফিরে এসেছে — সকালের ব্যস্ততা, দুপুরের ভিড়, সন্ধ্যার কফির সুবাস, দিনের শেষে হিসাব মেলানো। শুধু একটা পরিবর্তন হয়েছে, বাইরে নয়, হৈমীর ভেতরে। আগে কাজের ফাঁকে পাহাড়ের কথা হঠাৎ মনে পড়ত, আবার মিলিয়েও যেত। এখন স্মৃতিগুলো একটু বেশি সময় ধরে পাশে বসে থাকে। কুয়াশাভেজা সকাল, ঝিরির শব্দ, চার্চের ঘণ্টাধ্বনি — সব যেন অকারণেই ফিরে ফিরে আসে।

একদিন সকালে কাজে যাওয়ার পথে একটা ফুলের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। দোকানের কোণে রাখা কয়েকটা সাদা অর্কিড, ঠিক দেবাছড়া পাড়ার পেছনের বনে যেমনটা ফুটত। কতদিন এমন ফুল হাতে ছোঁয়নি, ভাবতে গিয়ে নিজেই অবাক হলো।

সেদিন বিকেলে কফি হাউসে ভিড় ছিল মাঝারি। কেউ ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে, কেউ নীরবে বই পড়ছে। দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল, সায়েম ঢুকলেন সঙ্গে দুজন সহকর্মী নিয়ে। এবার চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না। দুজনেই হালকা মাথা নেড়ে সৌজন্যের হাসি বিনিময় করল, এর বেশি কিছু নয়। একজন কর্মী তাঁদের ভেতরের একটা টেবিল দেখিয়ে দিল, তাঁরা গিয়ে বসলেন।

হৈমী আবার নিজের কাজে মন দিল। ব্যস্ততার মধ্যেই মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছিল, সায়েম মনোযোগ দিয়ে সহকর্মীদের কথা শুনছেন, কখনো হালকা হেসে কিছু বলছেন, কখনো নীরবে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন। বারো বছর আগের সেই বড়দিনের কথা মনে পড়ে গেল তার। তখনও মানুষটাকে খুব বেশি কথা বলতে দেখেনি, বরং চার্চের উঠোনে বেঞ্চ সরাতে, গ্রামের প্রবীণদের সাথে গল্প করতে দেখেছিল। কিছু মানুষের স্বভাব বোধহয় সময়ের সঙ্গেও খুব বেশি বদলায় না।

প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁরা বিল দিতে কাউন্টারে এলেন। সায়েম কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

— সেদিনের পর একটা কথা মনে হচ্ছিল। আপনাদের গ্রামের বড়দিনের সেই দুটো দিন আজও আমার ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটা। অনেক জায়গায় গেছি, কিন্তু ওই আন্তরিকতাটা আর কোথাও পাইনি।

হৈমীর মুখে অজান্তেই হাসি ফুটল।

— পাহাড়ের মানুষ অতিথি পেলে খুব খুশি হয়।

— সেটা বুঝেছিলাম। তাই হয়তো এত বছর পরও ভুলতে পারিনি। কাজের ব্যস্ততায় এখন আর আগের মতো ঘোরা হয় না, তবু সুযোগ পেলেই পাহাড়ে চলে যাই। অদ্ভুত ব্যাপার, যতবার যাই, মনে হয় কিছু একটা এখনও আমাকে সেখানে ডেকে নিয়ে যায়।

হৈমী কোনো উত্তর দিল না; শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। কথাটা সাধারণ, তবু মনে হলো এই অনুভূতিটা সে বুঝতে পারে। হয়তো কোনো জায়গা শুধু ভ্রমণের স্মৃতি হয়ে থাকে না, কখনো কখনো সেই জায়গাই মানুষের ভেতরে নীরবে বাসা বেঁধে ফেলে। সায়েম রসিদ ভাঁজ করে পকেটে রেখে বিদায় নিলেন। কাঁচের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু কাজে ফিরেও হৈমীর মনে বারবার ফিরে আসছিল শেষ কথাটা — “যতবার যাই, মনে হয় কিছু একটা এখনও আমাকে সেখানে ডেকে নিয়ে যায়।” সে জানত না ঠিক কী তাকে স্পর্শ করল, শুধু অনুভব করল নিজের ভেতরেও যেন বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা একটা নীরব ডাক ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এরপর আরও কয়েকবার দেখা হলো, একই রকম সংক্ষিপ্ত সৌজন্যের মধ্য দিয়ে। প্রতিবারই চোখাচোখি, সামান্য মাথা নাড়া, তারপর যে যার কাজে ফিরে যাওয়া। কোনো অস্বস্তি ছিল না এতে, কোনো অতিরিক্ত সৌজন্যও না, শুধু বহু বছর আগের এক পরিচয়ের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা।

একদিন সন্ধ্যায় সায়েম রসিদ হাতে নিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,

— একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে… এখনো কি সুযোগ পেলেই বাড়ি যাওয়া হয়?

হৈমী একটু চুপ করে থেকে বলল,

— আগের মতো নিয়মিত হয় না। তবে সুযোগ পেলেই যাই।

সায়েম মন দিয়ে শুনছিলেন। হৈমী নিজেই কথাটা এগিয়ে নিল।

— আগে সব চিন্তা ছিল বাড়ির জন্য। দুই ভাই তখনও দাঁড়িয়ে ওঠেনি, তিন বোনের বিয়েও বাকি ছিল। এখন সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে মনে হয়, এত বছর কবে পেরিয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।

সায়েম ধীরে মাথা নাড়লেন।

— সময়ের হিসাব আমরা সাধারণত পরে গিয়েই বুঝতে পারি।

একটু নীরবতা নেমে এল। তারপর যেন নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলতে বলতে বললেন,

— গত মাসে বান্দরবানের এক গ্রামে গিয়েছিলাম। একটা পুরনো ঝিরির পথ দিয়ে হাঁটছিলাম, আগাছায় প্রায় ঢেকে গেছে। সঙ্গে থাকা এক বৃদ্ধ বললেন, “পথ তো আছে, মানুষ কম হাঁটে এখন।” কথাটা তখন খুব সাধারণই মনে হয়েছিল, ফিরে আসার পর থেকে বারবার মনে পড়ছে।

হৈমী কোনো মন্তব্য করল না, শুধু শুনছিল। সায়েমও আর কথাটা বাড়ালেন না। একজন কর্মী এসে ডাকতেই সায়েম বুঝলেন আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না, বিদায় নিয়ে সহকর্মীদের সাথে রাতের ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন।

হৈমী আবার কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল, একজন গ্রাহকের বিল নিল, খুচরা টাকা ফেরত দিল। সবকিছু আগের মতোই চলছিল। কিন্তু তার ভেতরে কোথায় যেন একটা বাক্য নীরবে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল — “পথ তো আছে, মানুষ কম হাঁটে এখন।” সে হঠাৎ ভাবল, দেবাছড়া পাড়ায় ফেরার পথটাও কি এখনও আগের মতোই আছে? নাকি পথ বদলায়নি, বদলে গেছে শুধু তার হাঁটার অভ্যাস? প্রশ্নটার উত্তর সে জানত না, তবু মনে হলো অনেক দিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা কোনো দরজা যেন ভেতর থেকে খুব আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করেছে।

সেদিন কফি হাউস বন্ধ হতে হতে রাত সাড়ে দশটা পেরিয়ে গেল। দিনের শেষ হিসাব মিলিয়ে ক্যাশ বুঝিয়ে দিয়ে ব্যাগ কাঁধে তুলে বেরিয়ে এল হৈমী। ঢাকার রাত তখনও জেগে, রাস্তার দুপাশে আলো ঝলমল করছে, ফুটপাতে চায়ের দোকানে শেষ মুহূর্তের আড্ডা।

বাসে জানালার পাশে বসে কপাল ঠান্ডা কাঁচে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল সে। মনে পড়ল শীতের ভোরে বাবার সাথে জুমের পথে হাঁটার কথা। কাঁধে কোদাল, হাতে বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে মা এগিয়ে চলেছেন, পেছনে ভাইবোনদের হাসির শব্দ, পাহাড়ি পথের দুপাশে শিশিরভেজা ঘাস। স্মৃতিটা যেন খুব কাছে এসেও আবার ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। কন্ডাক্টরের ডাক শুনে বাস্তবে ফিরল সে — “বাড্ডা… বাড্ডা…”

বাসা পৌঁছাতে রাত প্রায় এগারোটা। দিদি তখনও জেগে ছিলেন।

— আজ খুব ক্লান্ত লাগছে তোকে।

— হয়তো একটু।

— খাবার ঢেকে রেখেছি, খেয়ে নিস।

এর বেশি কোনো কথা হলো না। এত বছরের একসাথে থাকার পর দুজনেই জানে, সব নীরবতার ব্যাখ্যা শব্দ দিয়ে করতে হয় না।

খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে ফিরল হৈমী। টেবিলের ওপর রাখা বাইবেলের পাশে ফ্রেমে বাঁধানো পাহাড়ের ছবিটায় চোখ আটকে গেল। কত দিন যে ছবিটাকে এভাবে মন দিয়ে দেখা হয়নি! ধীরে ধীরে ছবিটা হাতে তুলে নিল, কাঁচের ওপর জমে থাকা হালকা ধুলো মুছে দিল। ছবিতে সবুজ পাহাড়ের ঢাল, বাঁশঝাড় আর দূরে কুয়াশায় ঢাকা টিলা। একসময় এই দৃশ্যই ছিল তার প্রতিদিনের সকাল, আজ সেটাই দেয়ালে ঝুলে থাকা একটা ছবি মাত্র। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে যত্ন করে আবার আগের জায়গায় টাঙিয়ে দিল।

ডায়েরিটা খুলল। অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে থেকে শেষে লিখল — “হয়তো কিছু পথ কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু একদিন আবার হাঁটা শুরু করতে হয়।”

ডায়েরি বন্ধ করে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দূরের আকাশে তারা দেখা যায় না, শুধু অসংখ্য ভবনের আলো। মনে হলো, এই মুহূর্তে দেবাছড়া পাড়ায় নিশ্চয়ই চারপাশ নিস্তব্ধ, পাহাড়ের গায়ে বাতাস বইছে, বাঁশপাতা দুলছে, রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হচ্ছে। অজান্তেই চোখ চলে গেল টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ক্যালেন্ডারের দিকে। অনেকদিন পর সেটা হাতে তুলে নিল, কোনো তারিখে দাগ দিল না, কোনো সিদ্ধান্তও নিল না, শুধু নীরবে হিসাব করতে লাগল কবে কয়েক দিনের ছুটি নেওয়া যেতে পারে।

বিছানায় শুয়ে আলো নিভিয়ে দেওয়ার পরও মনে হচ্ছিল, জীবনের সব পথ সামনে এগিয়ে যায় না। কিছু পথ মানুষকে অনেক বছর পর আবার নিজের শুরুতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেই পথ ধরে সে আদৌ হাঁটবে কি না, এখনও জানে না। তবে আজ বহুদিন পর প্রথমবার তার মনে হলো, সময় বের করা দরকার — শুধু বিশ্রামের জন্য নয়, নিজের ভেতরে বহুদিন ধরে নীরব হয়ে থাকা সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য।

পঞ্চদশ পর্ব : ফেরার আগে

পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হলো।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বাড্ডার সরু গলিতে সবজিওয়ালার হাঁক ভেসে আসছে। পাশের বাড়ির বারান্দায় কেউ গাছে পানি দিচ্ছেন, কোথাও স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল হৈমী।

কেন যেন আজ শহরটাকে একটু অন্যরকম লাগছিল।

শহর বদলায়নি।

বদলে গেছে তার ভেতরের দৃষ্টি।

রান্নাঘর থেকে দিদির ডাক এল—

— চা ঠান্ডা হয়ে যাবে, আয়।

— আসছি, দিদি।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসতেই দিদি একবার তার মুখের দিকে তাকালেন।

— কী রে, আজ তোকে কেমন যেন চুপচাপ লাগছে।

হৈমী হালকা হেসে বলল,

— এমনিই।

দিদিও মৃদু হেসে বললেন,

— তুই যখন বলিস “এমনিই”, তখনই বুঝি কিছু একটা ভাবছিস।

হৈমী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,

— দিদি, কখনো কি এমন হয়েছে—অনেক দিন কোথাও না গেলে, হঠাৎ মনে হয়েছে জায়গাটা তোমাকে ডাকছে?

দিদি উত্তর দেওয়ার আগে চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,

— হয়েছে।

— তারপর?

— একদিন চলে গিয়েছিলাম।

হৈমী অবাক হয়ে তাকাল।

দিদি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

— সব প্রশ্নের উত্তর অন্যের কাছে পাওয়া যায় না। কিছু উত্তর নিজের চোখে গিয়ে দেখতে হয়।

কথাটা শেষ করে তিনি আর কিছু বললেন না।

সেদিন কফি হাউসে পৌঁছেও কথাগুলো মাথা থেকে সরাতে পারল না হৈমী।

দুপুরের একটু ফাঁকে মালিক ছুটির রেজিস্টার খুলে বসেছিলেন। কর্মীরা যার যার প্রয়োজনমতো ছুটির আবেদন লিখে দিচ্ছিল।

হৈমী কিছুক্ষণ দূর থেকে রেজিস্টারটার দিকে তাকিয়ে রইল।

এত বছর ধরে ছুটি নেওয়ারও যেন একটা নির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বড়দিন কিংবা ভাই-বোনের বিয়ের মতো বিশেষ পারিবারিক উপলক্ষ ছাড়া আলাদা করে ছুটি নেওয়ার কথা সে খুব একটা ভাবত না। কাজের ব্যস্ততা আর একের পর এক দায়িত্বের ভেতর দিয়ে কখন যে একটি বছর পেরিয়ে আরেকটি বছর এসে দাঁড়িয়েছে, অনেক সময় সে নিজেও বুঝতে পারেনি। এমনও কয়েক বছর কেটে গেছে, যখন বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ছুটি নেওয়া আর হয়ে ওঠেনি।

মালিক চোখ তুলে বললেন,

— হৈমী, তোমার কিছু লাগবে?

সে একটু ইতস্তত করল। তারপর ধীরে এগিয়ে গিয়ে বলল,

— স্যার… অনেক বছর পর এবারের বড়দিনটা বাড়ির সবার সঙ্গে কাটাতে চাইছিলাম।

মালিক হালকা হেসে বললেন,

— অবশ্যই যাবে। অনেক দিন তো ছুটি নাও না। কবে থেকে লাগবে, লিখে দাও।

হৈমী কলমটা হাতে নিল। রেজিস্টারের পাতায় নিজের নামের পাশে ছুটির তারিখ লিখতে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড থেমে রইল। তারপর ধীরে ধীরে লিখে দিল।

কলমটা নামিয়ে দেওয়ার পর তার মনে হলো—এত বছর পরে এই প্রথম কোনো জরুরি দায়িত্ব নয়, নিজের মনই তাকে ছুটি নিতে বলছে।

রেজিস্টারটা মালিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে আবার কাউন্টারের কাজে ফিরে গেল।

কফি মেশিনের পরিচিত শব্দ ভেসে আসছে। নতুন গ্রাহক ঢুকছে। কেউ কফি নিচ্ছে, কেউ নীরবে বসে বই পড়ছে।

সবকিছু আগের মতোই চলছে।

তবু হৈমীর ভেতরে খুব শান্তভাবে একটি নতুন অনুভূতির জন্ম হলো।

অনেক দিন পর প্রথমবার সে অনুভব করল—

এই ছুটিটা শুধু বিশ্রামের জন্য নয়।

হয়তো বহুদিন ধরে ফেলে আসা নিজের একটা অংশকে আবার কাছ থেকে দেখার জন্য।

ছুটির আবেদন করার তিন দিন পরের কথা।

সন্ধ্যার ব্যস্ততা তখন ধীরে ধীরে বাড়ছে। কফি হাউসের প্রায় সব টেবিলেই অতিথি বসে আছেন। কফির সুবাস, মানুষের কথাবার্তা আর নরম আলো মিলিয়ে জায়গাটা প্রতিদিনের মতোই প্রাণবন্ত।

হৈমী কাজের ফাঁকেই লক্ষ্য করেছিল, সায়েম সেদিনও এসেছেন। সঙ্গে দুজন পরিচিত সহকর্মী। তিনজন জানালার পাশের একটি টেবিলে বসে গল্প করতে করতে কফি খাচ্ছিলেন। মাঝে একবার চোখাচোখি হলে দুজনেই পরিচিত মানুষের মতো হালকা হাসি বিনিময় করেছিল।

এরপর আবার সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

সময় গড়িয়ে গেল। অতিথিদের ভিড়ও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল।

সায়েম বিল পরিশোধ করতে কাউন্টারের সামনে এলেন।

হৈমী রসিদ এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— আজ একটা ভালো খবর আছে।

সায়েম আগ্রহ নিয়ে তাকালেন।

— কী খবর?

— এবার বড়দিনটা বাড়ির সবার সঙ্গে কাটাতে এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি যাচ্ছি।

সায়েমের মুখে আন্তরিক হাসি ফুটে উঠল।

— বেশ ভালো খবর। অনেক দিন পর নিশ্চয়ই?

— হ্যাঁ। এবার অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে যাচ্ছি।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর হৈমী নিজেই বলল,

— আগে বড়দিন কিংবা পরিবারের কোনো বিশেষ প্রয়োজনে বাড়ি গেলে মনে হতো, ছুটিটা যেন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কার জন্য কী নিয়ে যাব, কার কী কাজ করে দিতে হবে—এসবের মধ্যেই সময় কেটে যেত। এবার তেমন কোনো তাড়া নেই। শুধু সবার সঙ্গে একটু সময় কাটাতে চাই।

সায়েম মন দিয়ে শুনলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন,

— তাহলে এইবার সময়কে নিজের মতো চলতে দিন। সব সময় পরিকল্পনা করে কাটাতে হয় না।

হৈমী মাথা নাড়ল।

— হয়তো সেটাই করব।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে সায়েমের এক সহকর্মী ডাকলেন,

— সায়েম ভাই, চলবেন?

— আসছি।

সায়েম আবার হৈমীর দিকে তাকালেন।

— ভালোভাবে ঘুরে আসবেন।

হৈমী মৃদু হেসে বলল,

— ফিরে এসে দেখা হলে গল্প করব।

— সেটার অপেক্ষায় থাকলাম।

দুজনেই হালকা হেসে নিল।

সায়েম বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

হৈমী আবার কাউন্টারের কাজে ফিরে এল।

সামনের গ্রাহকের বিল করতে করতেই তার মনে হলো—

এবারের বাড়ি ফেরা সত্যিই অন্য রকম।

কোনো দায়িত্ব তাকে টানছে না। কোনো বাধ্যবাধকতাও নয়। শুধু বহুদিন পর নিজের মানুষগুলোর কাছে, নিজের পাহাড়ের কাছে কয়েকটা দিন নির্ভার হয়ে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে।

বাড়ি যাওয়ার আগের দিন।

সকালের ব্যস্ততা অন্য দিনের মতোই ছিল। কফি হাউসে ঢুকেই হৈমী প্রতিদিনের অভ্যাসমতো কাউন্টার গুছিয়ে নিল। ক্যাশ মিলিয়ে দেখল, আগের দিনের হিসাব ঠিক আছে কি না। সহকর্মীদের দৈনন্দিন কাজগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিল, যাতে তার অনুপস্থিতিতে কোনো অসুবিধা না হয়।

দুপুরের দিকে মালিক ক্যাশ কাউন্টারের কাছে এসে দাঁড়ালেন।

— সব ব্যবস্থা বুঝিয়ে দিয়েছ তো?

— জি। ক্যাশের খাতা, সরবরাহকারীদের বকেয়া হিসাব আর অনলাইন অর্ডারের তালিকাটাও লিখে রেখেছি।

মালিক সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন।

— জানতাম, তুমি কিছুই অসমাপ্ত রেখে যাবে না। নিশ্চিন্তে ঘুরে এসো। এখানকার দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে হবে না।

— ধন্যবাদ।

দিনটা ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে গেল।

রাত সাড়ে এগারোটায় বাস ছাড়বে, তাই আজ আগেভাগে বের হতে হবে।

সব হিসাব মিলিয়ে ক্যাশ বুঝিয়ে দিয়ে একে একে সহকর্মীদের বিদায় জানাল হৈমী।

— ভালোভাবে ঘুরে আসবেন, হৈমীদি। অনেক দিন পর যাচ্ছেন, পরিবারের সবার সঙ্গে ভালো সময় কাটিয়ে আসবেন।

আরেকজন হেসে বলল,

— আর আমাদের জন্য পাহাড়ের কিছু নিয়ে আসবেন কিন্তু!

হৈমী হেসে বলল,

— নিশ্চয়ই। তোমাদের জন্য কিছু না কিছু আনব।

বাড্ডার বাসায় ফিরতেই দিদি দরজা খুলে দিলেন।

ঘরে ঢুকেই দেখল, টেবিলের ওপর ছোট্ট একটা কাপড়ের ব্যাগ রাখা।

— এটা কী?

দিদি হেসে বললেন,

— পথে খিদে পেলে খেয়ে নিস। একটু কেক, বিস্কুট আর শুকনো ফল রেখেছি।

হৈমী ব্যাগটা হাতে তুলে নিল।

— তুমি আমার জন্য এত কিছু করো কেন, দিদি?

দিদি মৃদু হেসে বললেন,

— সব সম্পর্ক রক্তের হয় না রে, কিছু সম্পর্ক সময় তৈরি করে।

হৈমী আর কিছু বলতে পারল না। শুধু এগিয়ে গিয়ে দিদিকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল।

রাতের খাবার শেষ করে ছোট্ট ভ্রমণের ব্যাগটা গুছিয়ে নিল।

কয়েক জোড়া কাপড়।

একটা শাল।

ডায়েরি।

বাবার জন্য শহর থেকে কেনা একটি শক্তিশালী টর্চলাইট।

মায়ের জন্য উষ্ণ একটি শাল।

ব্যাগের চেইন টেনে বন্ধ করতে গিয়েও কয়েক মুহূর্ত থেমে রইল।

কতবার এমন করে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।

কিন্তু এবার ব্যাগের ভেতরে শুধু জিনিসপত্র নয়—এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তিও যেন গুছিয়ে নিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।

— আমি চললাম।

— ভালোভাবে যাস। পৌঁছে একটা খবর দিবি।

হৈমী মাথা নাড়ল।

দরজার বাইরে পা রাখতেই রাতের শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল।

রাত বাড়তে থাকল। বাস ছাড়তে এখনও কিছুটা সময় বাকি।

মায়ের নম্বরে ফোন করল।

— কখন রওনা দিবি, মা?

— কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস ছাড়বে মা, ভোরের দিকে পৌঁছে যাব।

— সাবধানে আসিস।

ফোনটা কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ মোবাইলটা হাতেই ধরে রইল।

জানালার বাইরে ঢাকা শহর তখনও আলোয় ভাসছে। কিন্তু তার মন যেন অনেক দূরে চলে গেছে।

মনে হচ্ছিল, সে শুধু কয়েক দিনের ছুটিতে যাচ্ছে না।

ফিরে যাচ্ছে এমন এক জায়গায়, যেখানে তার শৈশব এখনও পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে মিশে আছে।

ঢাকা পেছনে রয়ে গেল।

আর সামনে অপেক্ষা করছিল—

একটি দীর্ঘ রাতের পথ,

যার শেষে ভোরের আলোয় আবার দেখা দেবে বহু বছর ধরে হৃদয়ে বয়ে বেড়ানো সেই সবুজ পাহাড়।

ষোড়শ পর্ব : শিকড়ের পথে

রাতভর ছুটে চলার পর ভোরের আলো ফুটতেই দিগন্তে দূরের পাহাড়গুলোর নীলচে রেখা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। বাসের জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল হৈমী। কতবার যে এই পথ পাড়ি দিয়েছে, তার হিসাব নেই। তবু প্রতিবার পাহাড় প্রথম চোখে পড়ার অনুভূতিটা যেন নতুনই লাগে।

সকালের কিছুক্ষণ পর বাসটি বান্দরবান শহরের বাস টার্মিনালে এসে থামল। হৈমী নেমে গভীর করে শ্বাস নিল। বাতাসে শহরের গন্ধ আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে পাহাড়েরও এক পরিচিত স্নিগ্ধতা। চারপাশ তখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। চায়ের দোকানে বড় কেতলিতে চা ফুটছে। দূরে কয়েকটি চাঁদের গাড়ি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।

পিঠে ব্যাগ তুলে একটি অটোরিকশায় উঠে বলল,

— থানচির বাসস্ট্যান্ডে যাবেন।

অটোরিকশা শহরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল। রাস্তার দুপাশে নতুন কিছু ভবন চোখে পড়ল। আবার অনেক পুরোনো দোকানও আগের মতোই রয়ে গেছে। সময় থেমে থাকে না। তবু কিছু জায়গা বদলালেও নিজের পরিচয় হারায় না।

বান্দরবান শহরের থানচিগামী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে একটি লোকাল বাসে উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল হৈমী।

ধীরে ধীরে বাস ভরে উঠল। কেউ থানচি বাজারে যাচ্ছে। কেউ আত্মীয়ের বাড়ি। কেউ আবার থানচি হয়ে নিজের পাহাড়ি পাড়ায় ফিরছে। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কারও সঙ্গে ছোটখাটো ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

একসময় বাস ছেড়ে দিল। বান্দরবান শহর পেছনে মিলিয়ে যেতে লাগল। তারপর শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তার অন্তহীন বাঁক। একটার পর একটা উঁচু-নিচু ঢাল। গভীর খাদ। সবুজ অরণ্য। মাঝেমধ্যে বাস থামছে। যাত্রী উঠছে, নামছে। কোথাও ছোট্ট বিরতি। চায়ের দোকানের সামনে দু-এক মিনিট দাঁড়িয়ে আবার চলতে শুরু করছে।

হৈমী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, এত বছর পরও পাহাড়ের রঙ বদলায়নি। শুধু বদলে গেছে সময়।

সকাল গড়িয়ে যখন বাসটি থানচি বাজারে পৌঁছাল, সূর্য তখন অনেকটাই ওপরে উঠে গেছে। বাস থেকে নেমে সে কিছুক্ষণ চারপাশে দাঁড়িয়ে রইল। থানচি বাজার আগের চেয়ে একটু বড় হয়েছে। নতুন কয়েকটি দোকান হয়েছে। তবু পাহাড়ি জনপদের সেই সহজ ছন্দটা এখনও একই রকম।

কিছুক্ষণ পর সে দেবাছড়ার দিকে যাওয়া একটি চাঁদের গাড়ির কাছে এগিয়ে গেল। চালক যাত্রী ডাকছিলেন। হৈমী কাছে গিয়ে বলল,

— দেবাছড়া পাড়া যাবেন?

চালক মাথা নেড়ে বললেন,

— হ, উঠেন।

গাড়িতে ইতিমধ্যে কয়েকজন যাত্রী বসে আছেন। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ। কারও কোলে মুরগির ঝুড়ি। কেউ আবার নীরবে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। আরও কয়েকজন উঠতেই চালক ইঞ্জিন চালু করলেন।

চাঁদের গাড়ি ধীরে ধীরে থানচি বাজার ছেড়ে আরও ভেতরের পাহাড়ি পথে এগিয়ে চলল। পাকা রাস্তা ক্রমেই সরু হয়ে এল। দু-পাশে ঘন বাঁশঝাড়। কোথাও ঝিরির স্বচ্ছ পানি রোদের আলোয় চিকচিক করছে। কোথাও পাহাড়ি ঢালে জুমের জমি।

হঠাৎ একসময় দূরে পরিচিত একটি পাহাড় চোখে পড়তেই হৈমীর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ জেগে উঠল। এই পাহাড়টাকে সে চেনে। এর পরেই…

দেবাছড়া।

সে অজান্তেই জানালার ধারে আরেকটু ঝুঁকে বসল।

আর খুব বেশি দূর নয়।

নিজের পাহাড়ে ফিরতে আর মাত্র কিছুটা পথ।

চাঁদের গাড়িটা আরেকটি পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে ধীরে ধীরে থামল। চালক বললেন,

— দেবাছড়া পাড়া।

হৈমী ব্যাগটা কাঁধে তুলে নেমে এল। চাঁদের গাড়িটা আবার ধুলো উড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

চারপাশে মুহূর্তেই নেমে এল সেই চেনা পাহাড়ি নীরবতা। সামনের সরু পথটা এখনও আগের মতোই বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে পাড়ার দিকে চলে গেছে। পাশের ঝিরিটা স্বচ্ছ পানি নিয়ে নীরবে বয়ে চলেছে। হৈমী ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।

একটা বাঁক ঘুরতেই দূরে গির্জার চূড়াটা চোখে পড়ল। গির্জাটা আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। তবে পাশের মাঠে এখন নতুন একটি টিনের ছাউনি হয়েছে। আরও একটু এগিয়ে সে দেখল, ছোটবেলায় যে আমগাছটার নিচে তারা খেলত, সেটি এখন বিশাল ছায়া মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কিছু মুখ একেবারেই অচেনা। সময় শুধু মানুষকেই বদলায় না, গ্রামকেও বদলে দেয়।

ঠিক তখনই কয়েকজন শিশু দৌড়াতে দৌড়াতে পাশ দিয়ে গেল। তাদের একজন অপরিচিত মুখ দেখে থেমে কৌতূহলী চোখে হৈমীর দিকে তাকাল। তারপর পাড়ার ভেতরের দিকে ছুটে গিয়ে কাউকে যেন খবর দিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দু-একজন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তাদের মধ্যে একজন হৈমীকে দেখে বিস্মিত স্বরে বললেন,

— আরে, হৈমী! তুই এসেছিস?

হৈমী এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাত ছুঁয়ে সম্ভাষণ জানাল।

— ভালো আছেন, কাকী?

— প্রভুর কৃপায় আছি। তুই কেমন আছিস?

— ভালো আছি।

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,

— তোরে দেখে মনে হচ্ছে, শহর তোকে বদলাতে পারে নাই।

হৈমীও হেসে ফেলল।

এরপর আর দাঁড়াল না। বাড়ির পথটা যেন নিজেই তাকে টেনে নিয়ে চলেছে। বাঁশের বেড়াটা নতুন করে বাঁধা হয়েছে। উঠোনটা আগের চেয়ে আরও গোছানো। বারান্দার পাশে কয়েকটি নতুন ফলের চারা লাগানো হয়েছে।

উঠোনে জরামণি বসে বাঁশের ঝুড়ি মেরামত করছিলেন। সুবর্ণা রান্নাঘরের সামনে শুকনো মরিচ রোদে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পায়ের শব্দে দুজনেই মুখ তুলে তাকালেন। সুবর্ণার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

— এসে গেছিস, মা।

হৈমীও হাসল।

— জি, মা।

জরামণি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,

— পথে কষ্ট হলো না তো?

— না, বাবা। ভালোভাবেই এসেছি।

জরামণি এগিয়ে এসে কোনো কথা না বলে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে নিজের হাতে তুলে নিলেন। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন,

— চল, আগে ঘরে চল। এত পথ এসেছিস, নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে।

হৈমী বাবার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। উঠোনে পা রাখতেই নাকে এল সেই চেনা মাটির গন্ধ। মুহূর্তেই মনে হলো, এত বছরেও এই গন্ধ তার কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠেনি।

দূরে বাঁশবনের মাথায় হালকা বাতাস বয়ে গেল।

পাহাড় কোনো আয়োজন করল না।

শুধু তার চেনা নীরবতায় হৈমীকে আবার আপন করে নিল।

বিকেলের রোদ তখন পশ্চিমের পাহাড়ের ঢালে নরম হয়ে এসেছে।

দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিল হৈমী। ঘুম আসেনি। এত বছর পর নিজের ঘরে ফিরে প্রতিটি পরিচিত শব্দ যেন নতুন করে কানে বাজছিল। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার মৃদু শব্দ। ঝিরির পানি আপন ছন্দে বয়ে চলেছে। বাঁশবনের মাথায় বাতাস লাগলে যে দীর্ঘ, মৃদু সুর ভেসে ওঠে, সেটাও কত বছর শোনা হয়নি।

বারান্দায় বেরিয়ে দেখল, জরামণি উঠোনের এক পাশে বসে কোদালের হাতল ঠিক করছেন। হৈমী এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল।

জরামণি তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— ক্লান্তি কেটেছে?

— অনেকটাই।

কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। বাবা-মেয়ের এই নীরবতারও যেন নিজস্ব একটা ভাষা আছে।

জরামণিই বললেন,

— চল, একটু হাঁটতে যাই।

হৈমী নীরবে উঠে দাঁড়াল। দুজন পাড়ার সরু পথ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। যাদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, সবাই আন্তরিক হাসিতে কুশল জানতে চাইছে।

কেউ বলছে,

— কত দিন পর ফিরলি!

কেউ আবার বলছে,

— কদিন থাকবি এবার?

হৈমী শুধু হাসিমুখে উত্তর দিচ্ছে। পাহাড়ে ফিরে আসা মানুষকে প্রশ্নের চেয়ে আপন করে নেওয়ার আনন্দই যেন বড়।

একসময় তারা পাড়া ছেড়ে আরও ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। একটা ঢালু জায়গায় এসে জরামণি থামলেন। সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন,

— চিনতে পারছিস?

হৈমী তাকিয়ে রইল। পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি পুরোনো আমগাছ। চারপাশে বুনো ঘাস আর ছোট ছোট ঝোপ।

জায়গাটা দেখেই হৈমীর মনে পড়ল ছোটবেলার কত দুপুরের কথা, এই পথ দিয়ে বাবার সঙ্গে হেঁটে যাওয়া, আমগাছের ছায়ায় বসে থাকা, আর চারপাশের পাহাড়ি বাতাসে হারিয়ে থাকা সেই দিনগুলো। এত বছর পরও জায়গাটার ভেতর সেই পুরোনো পরিচিতিটুকু রয়ে গেছে।

সে চারদিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

— বাবা, এই জমিটাই তো আমাদের, তাই না?

জরামণি মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। দাদার সময় থেকে আছে। পরে আমার ভাগে এসেছে। এখন তোদেরও অংশ আছে।

হৈমী কিছুক্ষণ চুপ করে জমিটার দিকে তাকিয়ে রইল। জায়গাটা তার খুব পরিচিত, তবু এত বছর পর ফিরে এসে আজ যেন নতুন করে দেখল।

জরামণি শান্ত গলায় বললেন,

— জুমের জন্য খুব সুবিধার না। ঢাল বেশি, মাটিও শক্ত। তাই কয়েক বছর ধরে তেমন চাষ করি না। শুধু গাছগুলো বাঁচিয়ে রেখেছি।

হৈমীর চোখ তখনও জমিটার ওপর। উঁচু আমগাছের ছায়ায় মাটি স্যাঁতসেঁতে। পাতার ফাঁক দিয়ে ছিটেফোঁটা রোদ পড়ছে। চারদিকে এক ধরনের শীতল নীরবতা। অদ্ভুতভাবে জায়গাটা তার ভালো লাগতে শুরু করল।

জরামণি আবার বললেন,

— ফেলে রাখতে খারাপ লাগে। কিন্তু সব জমিতে তো আর সব ফসল হয় না।

হৈমী ধীরে ধীরে নিচু হয়ে একমুঠো মাটি হাতে তুলে নিল। মাটিটা আঙুলের ফাঁকে আলতো করে মেখে দেখল। কোনো মন্তব্য করল না। কিছুক্ষণ পর আবার মাটিটা আগের জায়গাতেই ছেড়ে দিল।

জরামণি মেয়ের দিকে একবার তাকালেন। কিছু বললেন না। তবে তাঁর মনে হলো, বহু বছর পর হৈমী যেন প্রথমবার এই জমিটাকে সত্যিই দেখছে।

ফেরার পথে দুজনের কেউই আর তেমন কথা বলল না। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে নেমে আসছিল। বাতাসে শুকনো পাতার মৃদু শব্দ। হৈমীর হাতের তালুতে মাটির গন্ধ তখনও লেগে আছে।

অকারণেই সে একবার হাতের দিকে তাকাল। তারপর সামনে হাঁটতে থাকা বাবার দিকে।

মনে একটিই প্রশ্ন নিঃশব্দে ভেসে উঠল—

মানুষ কি শুধু শিকড়ে ফিরে আসে?

নাকি একসময় শিকড়ই তাকে ফিরে আসার ডাক দেয়?

দূরের পাহাড় তখন কোনো উত্তর দিল না।

শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল, যেমন দাঁড়িয়ে ছিল এতগুলো বছর।

সপ্তদশ পর্ব : ফিরে আসার আলো

আর মাত্র একদিন পর বড়দিন।

দেবাছড়া পাড়ায় উৎসবের আবহ ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে। গির্জার সামনে কিশোরেরা বাঁশ বেঁধে রঙিন কাগজের তারা ঝুলিয়ে দিচ্ছে। কয়েকজন তরুণ আলোর মালা ঠিক করছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ভেসে আসছে শিশুদের ক্যারল গাওয়ার মহড়া। পাড়ার নারীরা দল বেঁধে কেক, পিঠা আর উৎসবের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত।

শীতের সকালের বাতাসে আজ যেন আলাদা এক উষ্ণতা।

উঠোনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছিল হৈমী। কত বছর পর আবার বড়দিনের আগের দিনটা নিজের গ্রামে কাটাচ্ছে সে!

সকালের দিকে একে একে সবাই আসতে শুরু করল—কেউ চাঁদের গাড়িতে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ ভাড়ার জিপে। দুপুরের আগেই দুই ভাই আর তিন ছোট বোন নিজেদের পরিবার নিয়ে এসে পৌঁছাল। মুহূর্তের মধ্যেই শান্ত উঠোন ভরে উঠল হাসি-আনন্দে।

ভাতিজা, ভাতিজি, ভাগিনা আর ভাগ্নিরা এক কোণ থেকে আরেক কোণে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের হাসির শব্দে বাড়িটা যেন আবার বহু বছর আগের দিনগুলোয় ফিরে গেল।

সুবর্ণা কখনো রান্নাঘরে যাচ্ছেন, কখনো উঠোনে ফিরে আসছেন। নাতি-নাতনিদের হাতে পিঠা তুলে দিচ্ছেন, আবার হাঁড়িতে কী হচ্ছে দেখে নিচ্ছেন। জরামণিও বসে থাকলেন না। কারও হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে বারান্দায় রাখছেন, কারও কাঁধে হাত রেখে খোঁজখবর নিচ্ছেন। ছোট্ট এক নাতিকে কোলে তুলে হেসে বললেন,

— এইটুকু আছিলি, এখন তো দেখি আমার কোলে ধরাই যায় না!

চারদিকে হাসির রোল উঠল।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল হৈমী। ছোট ভাই এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— দিদি, অনেক বছর পর আবার সবাই একসঙ্গে বড়দিন করছি।

— হ্যাঁ, সত্যিই অনেক বছর পর, মৃদু হেসে বলল হৈমী।

মেজো বোন যোগ করল,

— মা কয়দিন ধরেই শুধু তোর কথাই বলছিল।

সুবর্ণা শুনে হেসে বললেন,

— সবাই তো আসে। কিন্তু বড় মেয়েটা না থাকলে বাড়িটা কেমন যেন খালি খালি লাগে।

হৈমী কিছু বলল না। শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল।

বিকেলের দিকে গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল। পাড়ার মানুষ একে একে গির্জার দিকে রওনা দিল। হৈমীও সবার সঙ্গে হাঁটতে লাগল। পথের দুপাশে পরিচিত মুখ—কেউ কুশল জিজ্ঞেস করছে, কেউ হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।

গির্জার উঠোনে পৌঁছে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ক্যারলের শেষ মহড়া দিচ্ছে। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল।

সময় যেন এক অদ্ভুত বৃত্ত—এক প্রজন্মের গান শেষ হলে আরেক প্রজন্ম একই সুর তুলে নেয়।

সূর্য তখন পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে নামছে। সোনালি আলো গির্জার ক্রুশের ওপর এসে পড়েছে। চারদিকে তাকিয়ে হৈমীর মনে হলো—এই পাহাড়, এই মানুষগুলো, এই একসঙ্গে থাকার অনুভূতিকে সে কত গভীরভাবে মিস করেছে!

ফেরার পথে তার মনে নিঃশব্দে প্রশ্ন জাগল—

এই বাড়িটা কি এত দিন তার জন্য অপেক্ষা করছিল? নাকি সে-ই ফিরতে এত দেরি করে ফেলেছে?

বড়দিনের সকাল

 

সূর্য ওঠার পরও কুয়াশা পুরোপুরি সরে যায়নি। গির্জার ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসতেই দেবাছড়া পাড়া জেগে উঠল।

উৎসবের পোশাক পরে সবাই একসঙ্গে গির্জার দিকে রওনা দিল। জরামণি, সুবর্ণা, দুই ভাই, তিন বোন—সবাই সন্তানদের নিয়ে পাশাপাশি হাঁটছে। হৈমী একটু পেছনে।

গির্জার ভেতর-বাইরে মানুষের ভিড়। আশপাশের অনেক পাহাড়ি পাড়া থেকেও মানুষ এসেছে। প্রার্থনা শেষে সবাই একে অপরকে বড়দিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে—করমর্দন, কোলাকুলি, খোঁজখবর, হাসিমুখ।

হৈমীর মনে হলো, পাহাড়ে বড়দিন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এ যেন মানুষে মানুষে আবার ফিরে পাওয়ার দিন।

দুপুরে বাড়ি ফিরতেই আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীরা শুভেচ্ছা জানাতে এলেন। সুবর্ণা সবার হাতে কেক, পিঠা আর চা তুলে দিচ্ছেন। উঠোনজুড়ে বাচ্চাদের ছোটাছুটি।

সবচেয়ে ছোট ভাগ্নিটা এসে বলল,

— মাসি, চল না ঝিরির পাড় পর্যন্ত যাই।

— চল, হেসে বলল হৈমী।

ঝিরির ধারে পৌঁছে বাচ্চারা পাথর কুড়িয়ে পানিতে ছুড়ে খেলতে শুরু করল। হৈমী একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল। তার চোখ আবার চলে গেল সেই ঢালু জমিটার দিকে—পুরোনো আমগাছগুলো এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

মেজো ভাই পাশে এসে বলল,

— বাবা এখনও জমিটার যত্ন নেয়। জুমের জন্য সুবিধা না হলেও বিক্রি করতে চায় না। বলে, জমি একবার হাতছাড়া হলে আর ফিরে আসে না।

হৈমী ধীরে বলল,

— জায়গাটা খুব সুন্দর।

দুজনেই চুপ করে গেল। ঝিরির পানিতে ছুড়ে দেওয়া পাথরগুলো গোল গোল ঢেউ তুলে মিলিয়ে যাচ্ছে। হৈমী অনেকক্ষণ সেই ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

বিকেলে সবাই আবার বাড়িতে ফিরল। চা, পিঠা আর গল্পে সময় কেটে যাচ্ছিল। বারান্দায় বসে উঠোনের দিকে তাকিয়ে ছিল হৈমী। হঠাৎ মনে পড়ল—আর কয়েক দিন পরই তাকে আবার ঢাকায় ফিরতে হবে।

এবার কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এল।

এত বছর ধরে ছুটি শেষ মানেই কাজে ফেরা। আজ প্রথমবার মনে হলো, ফিরে যাওয়াটাই যেন কঠিন হয়ে উঠছে।

সন্ধ্যা নামার মুখে জরামণি চারদিকে তাকিয়ে বললেন,

— রাতে সবাই একসঙ্গে থাকবি। একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই।

হৈমী বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী কথা? সে জানে না। তবু মনে হলো, এই বড়দিন শুধু আরেকটি উৎসব হয়ে থাকবে না—হয়তো তার জীবনেরও নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়ে থাকবে।

রাতের খাবার শেষে উঠোনে ছোট্ট আগুন জ্বালানো হলো। দূরে কোনো গির্জা থেকে ক্যারলের সুর ভেসে আসছে। সবাই গোল হয়ে বসেছে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে জরামণি বললেন,

— সবাই যখন একসঙ্গে আছিস, আজ একটা কথা বলি।

তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,

— গতকাল হৈমীকে যে জমিটা দেখাইলাম, জুমের জন্য তেমন কাজে লাগে না। কয়েকটা পুরোনো আমগাছ আছে, বাকিটা পড়েই থাকে। আমি চাই, আজ থেকে ওই জমিটার দেখাশোনার দায়িত্ব হৈমী নিক। যদি কোনো দিন ও এই পাহাড়ে কিছু করতে চায়, যেন নতুন করে শুরু করতে না হয়।

হৈমী বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকাল।

ছোট ভাই বলল,

— আমার কোনো আপত্তি নেই। দিদি আমাদের জন্য যা করেছে, তার তুলনায় এটা কিছুই না।

মেজো ভাই যোগ করল,

— দিদি নিজের জীবনটাই আমাদের মানুষ করতে দিয়ে দিয়েছে। জমিটা যদি ওর কাজে লাগে, সেটাই আমাদের আনন্দ।

বোনেরাও সম্মতি জানাল। একজন বলল,

— দিদি যদি একদিন সত্যিই এখানে থেকে যায়, তার চেয়ে বড় খুশি আর কী হতে পারে!

সুবর্ণা শান্ত গলায় বললেন,

— হৈমী ছোটবেলা থেকেই শুধু নিজের কথা ভাবেনি। এবার যদি নিজের জন্য একটা পথ খুঁজে নিতে পারে, আমার খুব ভালো লাগবে।

উঠোনে আবার নীরবতা নেমে এল। আগুনের শিখা ধীরে ধীরে দুলছে।

হৈমী নিচু গলায় বলল,

— আমি তো শুধু ছুটি কাটাতে এসেছি। এত বড় কথা ভাবতেই পারিনি।

জরামণি মৃদু হেসে বললেন,

— আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। জমিটা থাকবে। তুই যখন যেটা ঠিক মনে করবি, তখনই শুরু করবি। আর জুমের জমিতেও তোর কোনো বাধা থাকবে না। আমি যত দিন পারি, পাশে থাকব।

হৈমীর চোখ ভিজে উঠল। সে মুখ নিচু করে রইল। কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এল না, কারণ এই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় আশ্বাস।

দূরে আবার গির্জার ঘণ্টা বাজল।

হৈমী ধীরে মাথা তুলে অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকাল। কয়েক দিন আগেও সে এখানে এসেছিল ছুটি কাটাতে। আজ মনে হলো, এই পাহাড়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু জন্মের নয়—দায়িত্বেরও।

আর সেই দায়িত্বের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে তার আগামী দিনের পথ।

অষ্টাদশ পর্ব : নিজের আকাশের নিচে

বড়দিনের ছুটি শেষ হলো। ফেরার সকালটা আগের যেকোনোবারের চেয়ে বেশি নীরব লাগছিল। সুবর্ণা ভোরে উঠে আগের মতোই পথের জন্য খাবার গুছিয়ে দিলেন। জরামণি নিজ হাতে ব্যাগটা তুলে নিয়ে চাঁদের গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। বিদায়ের সময় তিনি শুধু বললেন,

— নিজের খেয়াল রাখিস, মা।

হৈমী মাথা নাড়ল। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু গলায় যেন শব্দ আটকে ছিল। চাঁদের গাড়ি ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল। দেবাছড়া পাড়া চোখের আড়ালে চলে গেল। তবু অনেকক্ষণ পর্যন্ত হৈমীর চোখ পাহাড়ের দিকেই স্থির রইল।

থানচি পৌঁছে লোকাল বাসে বান্দরবান শহর। সেখান থেকে রাতের বাসে ঢাকা। পথ আগের মতোই ছিল। শুধু ফেরার অনুভূতিটা আগের মতো রইল না।

ঢাকায় ফিরে আবার শুরু হলো পরিচিত জীবন। প্রতিদিনের মতো সকালেই কফি হাউজ। কাউন্টারের হিসাব। গ্রাহকদের ব্যস্ততা। কফির কাপের পর কাপ। রাত শেষে ক্যাশ মিলিয়ে বাসায় ফেরা। সবই আগের মতো। শুধু হৈমীর ভেতরে যেন কিছু একটা নীরবে বদলে গেছে।

কাউন্টারে দাঁড়িয়ে কফির সুবাস পেলেই তার মনে পড়ে যায় পাহাড়ের ভেজা বাতাস। মনে হয়, পাহাড় যেন এখনও তাকে ছাড়েনি। ব্যস্ত শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখনও মনে হয়— এই সময় হয়তো বাবা জুম থেকে ফিরছেন। মা হয়তো সন্ধ্যার রান্নার আয়োজন করছেন। আর পাহাড়ের গায়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছে বিকেলের ছায়া।

একদিন দুপুরে মালিক কাউন্টারের পাশে এসে দাঁড়ালেন। হৈমীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— ছুটিটা নিশ্চয়ই ভালো কেটেছে?

— জি, খুব ভালো।

মালিক কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন,

— ভালোই হয়েছে। তবে ফিরে এসে দেখছি, মনটা যেন এখনও পাহাড়েই রয়ে গেছে।

হৈমী মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। মালিক আর কিছু বললেন না। নিজের কাজে ফিরে গেলেন।

রাত তখন প্রায় দশটা। কফি হাউজের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক সেই সময় কফি হাউজের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন সায়েম। হৈমী চোখ তুলে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— আসুন।

সায়েমও হেসে বললেন,

— ফিরেছেন তাহলে?

— জি। দুদিন হলো।

— বড়দিন কেমন কাটল?

হৈমীর চোখে অজান্তেই অন্যরকম এক আলো ফুটে উঠল।

— খুব ভালো। অনেক বছর পর পুরো পরিবার একসঙ্গে ছিল।

সায়েম মন দিয়ে শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন,

— কাকা-কাকিমা ভালো আছেন তো?

— জি, ভালো আছেন।

সায়েম মৃদু হেসে বললেন,

— ভালো লাগল শুনে। পাহাড় একবার যার আপন হয়ে যায়, তাকে সহজে ছাড়ে না।

কথাটা শুনে হৈমী কিছু বলল না। শুধু এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ যেন কোথাও দূরে চলে গেল। সায়েম সেটা লক্ষ্য করলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

— আপনাকে আজ একটু অন্যরকম লাগছে।

হৈমী অবাক হয়ে তাকাল।

— অন্যরকম?

— হ্যাঁ। ঠিক বোঝাতে পারব না। তবে মনে হচ্ছে, পাহাড় থেকে শুধু ফিরে আসেননি… সেখানে কিছু রেখে এসেছেন, আবার কিছু সঙ্গে করেও নিয়ে এসেছেন।

হৈমী অল্প হেসে বলল,

— হয়তো তাই।

ঠিক তখনই একজন কর্মী এসে বলল,

— হৈমীদি, এই বিলটা একবার দেখে দেবেন?

— দিচ্ছি।

বিলটা দেখে সংশোধন করে ফিরিয়ে দিল সে। সায়েম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করলেন। কাজ শেষ হলে তিনি বললেন,

— আপনার কাজ শেষ হতে আর কতক্ষণ লাগবে?

— আর দশ-পনেরো মিনিট।

— আমি অপেক্ষা করছি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে, কাজ শেষে আজ একটু গল্প করব।

হৈমী কয়েক মুহূর্ত ভেবে মাথা নাড়ল।

— আচ্ছা।

সায়েম কফির অর্ডার দিয়ে নীরবে বসে পড়লেন। হৈমী আবার নিজের কাজে ফিরে গেল। হাত ব্যস্ত ছিল হিসাবের খাতায়। কিন্তু মন যেন অপেক্ষা করছিল আসন্ন সেই কথোপকথনের জন্য, যার বিষয় সে এখনও জানে না।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। শেষ গ্রাহক বেরিয়ে যাওয়ার পর কফি হাউজের ভেতর ধীরে ধীরে নীরবতা নেমে এল। হৈমী দিনের শেষ হিসাব গুছিয়ে ক্যাশ বন্ধ করল। সব কাজ শেষ করে যখন ভেতরের দিকে তাকাল, দেখল সায়েম এখনও জানালার পাশের টেবিলে বসে আছেন। সামনের কফির কাপ প্রায় শেষ। হাতে একটি বই।

হৈমী এগিয়ে গিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত।

সায়েম বইটা বন্ধ করে বললেন,

— দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। আপনার কাজটাই আগে। বসুন?

হৈমী সামনের চেয়ারটায় বসল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর সায়েম বললেন,

— এবার বলুন, বড়দিন কেমন কাটল?

হৈমী যেন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই ছিল। ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল। বহু বছর পর সবাই একসঙ্গে বাড়ি ফিরেছিল। দুই ভাই। তিন বোন। ভাতিজা, ভাতিজি, ভাগিনা, ভাগ্নিদের কোলাহলে বাড়িটা আবার আগের মতো প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। বড়দিনের প্রার্থনা। গির্জার ক্যারল। পাহাড়ের কুয়াশা। ঝিরির ধারে হাঁটা। বাবার সঙ্গে ঢালের সেই পরিত্যক্ত জমিতে যাওয়া। তারপর রাতের পারিবারিক আড্ডা। সবাই মিলে বাবার কথা শোনা। জমিটার দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। হৈমী একে একে সব গল্প শোনাতে লাগল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললো,

— জানেন, এত বছর পরে প্রথমবার মনে হলো, ওরা শুধু আমাকে বেড়াতে ডাকে না… ফিরে যেতে ডাকে।

সায়েম কোনো কথা বললেন না। শুধু মন দিয়ে শুনছিলেন। কিছুক্ষণ পর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

— আপনার বাবা যে জমিটার কথা বললেন, সেটা কেমন?

হৈমী একটু ভেবে বলতে শুরু করল,

— ঢালু জমি। কয়েকটা পুরোনো আমগাছ আছে। পাশ দিয়ে একটা ঝিরি বয়ে গেছে। জায়গাটা সারাক্ষণ ঠান্ডা থাকে। পুরোটা রোদও পায় না, আবার পুরোটা ছায়াও নয়।

সায়েম মাথা নাড়লেন। আরও কিছু জানতে চাইলেন,

— মাটি কেমন?

— বেশ ঝুরঝুরে। পানি সহজেই নেমে যায়, বর্ষাতেও জমে থাকে না।

— জমিটা অনেক দিন ধরেই ফাঁকা?

— হ্যাঁ। বাবা বলেন, জুমের জন্য সুবিধা হয় না। তাই আর কিছু করা হয়নি।

সায়েম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মনে হলো, কথাগুলো ভেবে দেখছেন। তারপর ধীরে বললেন,

— আমি আপনাকে কোনো পরামর্শ দেওয়ার আগে একটা কথা বলতে চাই।

হৈমী তাকাল।

— যে জমি বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, সে সব সময় অনাবাদি থাকে না। অনেক সময় সে শুধু ঠিক মানুষের অপেক্ষায় থাকে।

হৈমী নীরবে শুনছিল। সায়েম আবার বললেন,

— আপনি যদি সত্যিই কোনো দিন ফিরে যান, তাহলে পাহাড়কে বদলাতে যাবেন না। আগে বোঝার চেষ্টা করবেন, পাহাড় নিজে কী দিতে চায়। তারপর সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করবেন।

কথাগুলো শুনে হৈমীর মনে হলো, বাবার কথার সঙ্গে যেন অদ্ভুত মিল আছে। সে একটু ইতস্তত করে বলল,

— একটা কথা বলব?

— বলেন।

— আপনি যদি আপত্তি না করেন… আজ থেকে আমাকে ‘তুমি’ বললে আমার ভালো লাগবে।

সায়েম হেসে ফেললেন।

— আচ্ছা। তাহলে আজ থেকে তোমাকে ‘তুমি’ বলেই ডাকব।

দুজনেই হালকা হেসে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই কথোপকথনের আনুষ্ঠানিকতা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল।

সায়েম পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন,

— এটা রেখে দাও।

হৈমী কার্ডটা হাতে নিল।

— যদি কোনো দিন সত্যিই শুরু করো, আর কোনো বিষয়ে মতামত দরকার হয়, ফোন করবে। আমি সব জানি, এমন দাবি করি না। তবে যতটুকু অভিজ্ঞতা আছে, ভাগ করে নিতে পারব।

হৈমী খুব যত্ন করে কার্ডটা ব্যাগে রেখে দিল। কফি হাউজের ভেতরের শেষ আলোটাও নিভিয়ে দেওয়া হলো। দুজনেই উঠে দাঁড়াল। বিদায় নেওয়ার আগে সায়েম শুধু বললেন,

— আজ তোমার কথা শুনে একটা জিনিস বুঝলাম।

হৈমী তাকাল।

— তুমি পাহাড় থেকে শুধু ফিরে আসোনি… পাহাড়ও তোমার সঙ্গে ফিরে এসেছে।

হৈমী কোনো উত্তর দিল না। শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। বাইরে তখন ঢাকার রাত। কিন্তু তার বুকের ভেতর যেন দূরের পাহাড়ি বাতাস নীরবে বয়ে চলেছে।

সেদিন রাতে বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ ঘুম এল না। ব্যাগ থেকে সায়েমের দেওয়া ভিজিটিং কার্ডটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল হৈমী। অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর আবার খুব যত্ন করে ব্যাগের ভেতর রেখে দিল।

সে জানত, কোনো মানুষ অন্য কারও জীবন গড়ে দিতে পারে না। তবে কখনও কখনও একজন মানুষের কয়েকটি কথা পথ চলার সাহস জোগায়।

পরের কয়েক দিন কফি হাউজে কাজ করলেও তার সিদ্ধান্ত আর বদলায়নি। অনেক ভেবেচিন্তেই একদিন মালিকের কক্ষে গিয়ে বলল,

— স্যার, একটা কথা ছিল।

মালিক চশমাটা খুলে তার দিকে তাকালেন।

— বলো।

— আমি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই।

কথাটা শুনে মালিক কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

— অন্য কোথাও যোগ দিচ্ছ?

— না, স্যার। আমি পাহাড়ে ফিরে যাচ্ছি। এবার স্থায়ীভাবেই।

মালিকের মুখে ধীর একটা হাসি ফুটে উঠল।

— তোমাকে আটকে রাখার অধিকার আমার নেই। শুধু একটা কথাই বলব—যে সততা নিয়ে এত বছর এখানে কাজ করেছ, নতুন জীবনেও সেটাই ধরে রেখো।

হৈমী মাথা নত করল।

— দোয়া করবেন।

মাসের শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে সে বিদায় নিল। সহকর্মীদের চোখেও জল ছিল। কেউ বিদায় বলল। কেউ শুধু হাতটা শক্ত করে ধরল। হৈমী বুঝল, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কখনও পদবি নয়—বিশ্বাস।

কয়েক সপ্তাহ পর আবার সেই পরিচিত পথ। রাতের বাসে বান্দরবান। লোকাল বাসে থানচি। তারপর চাঁদের গাড়ি। দেবাছড়া পাড়ার নাম উচ্চারণ হতেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এল। এবার সে অতিথি হয়ে আসেনি। ফিরে এসেছে নিজের ঘরে।

পরদিন ভোরে জরামণি তাকে নিয়ে আবার সেই ঢালের জমিতে গেলেন। শীতের শিশিরে ভেজা ঘাস। বহু বছরের পুরোনো আমগাছগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে ঝিরির স্বচ্ছ পানি বয়ে যাচ্ছে।

জরামণি চারদিকে তাকিয়ে বললেন,

— এবার থেকে জমিটার দায়িত্ব তোর। কী করবি, সেটা তুই ঠিক করবি।

হৈমী অনেকক্ষণ কিছু বলল না। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ধীরে বলল,

— আগে জমিটার ভাষা শিখতে চাই, বাবা। তারপর কাজ শুরু করব।

জরামণি মৃদু হেসে বললেন,

— জমিরও ভাষা আছে। যে সেই ভাষা বুঝতে শেখে, জমি তার সঙ্গে কখনও প্রতারণা করে না।

সেই দিন থেকেই শুরু হলো নতুন পথচলা। জমি পরিষ্কার করার কাজ শুরু হলো। আগাছা পরিষ্কার করা হলো। ঝিরির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কোথায়, বর্ষার পানি কোন দিকে নামে, কোথায় বেশি রোদ পড়ে, কোথায় দিনের বেশির ভাগ সময় ছায়া থাকে—সবকিছু ধীরে ধীরে খেয়াল করতে লাগল হৈমী।

মাঝেমধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে দ্বিধায় পড়লে মোবাইলে সায়েমের সঙ্গে কথা হতো। একদিন ছবি পাঠিয়ে বলল,

— এখানে বড় বড় আমগাছ আছে। অনেকে বলছে কেটে ফেলতে।

ওপাশ থেকে সায়েম বললেন,

— কাটবে না। বড় গাছগুলোই তোমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

হৈমী চুপচাপ শুনছিল। সায়েম আবার বললেন,

— পাহাড়ে অনেকেই খোলা জমি বানাতে গিয়ে সব গাছ কেটে ফেলে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে পাহাড়ে টিকে থাকা যায় না। প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হয়। যে গাছ এত বছর পাহাড়কে আগলে রেখেছে, তাকে কেটে নতুন স্বপ্ন শুরু করা যায় না।

এরপর দুজনে জমিটার সম্ভাবনা নিয়ে ধীরে ধীরে আলোচনা করতে লাগল। পুরোনো আমগাছের ছায়ায় কফির সারি হবে। সেই গাছগুলোকেই আশ্রয় করে ওপরে উঠবে গোলমরিচের লতা।যেসব গাছ শক্ত ও উঁচু, সেগুলোতে গোলমরিচের লতা ওঠানো যায়। আংশিক ছায়াযুক্ত ঢালে এলাচের চাষ করা যায়। ফাঁকা জায়গাগুলোতে আদা ও হলুদের আবাদ হতে পারে। ঢালের নিচের একটু উঁচু অংশে পাহাড়ি কমলা, মাল্টা, লেবু আর অ্যাভোকাডোর মতো ফলের গাছ লাগানো যায়।

সব পরিকল্পনা একসঙ্গে শুরু হয়নি। কোনো কিছুই তাড়াহুড়ো করে করা হয়নি। একটি কাজ শেষ হয়েছে। তারপর শুরু হয়েছে আরেকটি।

এই সময় গ্রামের কয়েকজন নারী প্রায়ই এসে কাজ দেখতে দাঁড়াতেন। প্রথমে তিনজন এলেন। তারপর পাঁচজন। তারপর আরও কয়েকজন। কেউ আগাছা পরিষ্কার করতে সাহায্য করতেন। কেউ চারা রোপণের সময় পাশে থাকতেন। ধীরে ধীরে কাজটা শুধু হৈমীর একার রইল না। এটা গ্রামেরও একটি স্বপ্ন হয়ে উঠতে শুরু করল।

একদিন বিকেলে সবাই মিলে নতুন উদ্যোগের একটা নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। অনেক নাম উঠল। কেউ পাহাড়ের নাম রাখতে চাইল। কেউ ঝিরির নাম। হৈমী অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,

— অরণ্যপত্র কেমন হবে?

মুহূর্তের জন্য সবাই নীরব। জরামণি প্রথম মাথা নাড়লেন,

— ভালো নাম। এই পাহাড়ের মাটি আর অরণ্যের যা কিছু আছে, একদিন যদি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারিস, তার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?

সুবর্ণার মুখে হাসি ফুটল। গ্রামের নারীরাও সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। সেদিন বিকেলের নরম আলোয়, পাহাড়ের নীরবতাকে সাক্ষী রেখে জন্ম নিল—

অরণ্যপত্র।

সেদিন নামটি শুধু উচ্চারণ করা হয়েছিল। তখনও কেউ জানত না, একদিন এই নামেই দেবাছড়া পাড়াকে অনেকে চিনবে।

সময় তখন ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে এগিয়ে চলেছে। কেউ তাড়াহুড়ো করছে না। কারণ পাহাড় জানে—

শিকড় যত গভীর হয়, ফল তত মধুর হয়।

পাঁচ বছর পর।

ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে দেবাছড়া পাড়ার পাহাড় ছুঁয়ে নামছে। রাতের শিশিরে ভেজা কফি গাছের পাতাগুলো আলোয় চিকচিক করছে। ডালে ডালে ঝুলছে লাল হয়ে ওঠা কফি চেরি। পুরোনো আমগাছগুলো আজও আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গা বেয়ে অনেক ওপরে উঠে গেছে গোলমরিচের লতা। আংশিক ছায়াযুক্ত ঢালে সবুজ হয়ে উঠেছে এলাচের গাছ। আরেক পাশে সারি সারি আদা আর হলুদের ক্ষেত। ঢালের একটু উঁচু অংশে পাহাড়ি কমলা, মাল্টা, লেবু আর অ্যাভোকাডোর গাছগুলোও এখন ফল দিতে শুরু করেছে। একসময়ের পরিত্যক্ত ঢালু জমি এখন যেন প্রকৃতি আর মানুষের যৌথ শ্রমের এক জীবন্ত উদ্যান।

অরণ্যপত্র এখন শুধু একটি খামারের নাম নয়। এটি পাহাড়ি কৃষি, স্থানীয় ফল, মসলা, কফি এবং পাহাড়ি নারীদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ। জমির একপাশে বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট কয়েকটা কটেজ, যেখানে দূর-দূরান্তের মানুষ এসে থাকতে পারে, পাহাড়ের নিস্তব্ধতা অনুভব করতে পারে, খেতে পারে হাতে তৈরি পাহাড়ি খাবার। ছোট্ট এই থাকার জায়গাটার নাম হৈমী রেখেছে “মেঘের বাড়ি”।

প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পথ, প্রতিটি চারা যেন একটি করে গল্প বলে। সকালের কিছু পর থেকেই গ্রামের নারীরা একে একে এসে জড়ো হতে লাগলেন। কেউ পাকা কফি চেরি তুলছেন। কেউ গোলমরিচ শুকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ বীজতলায় নতুন চারা পরিচর্যা করছেন। কেউ আবার সদ্য তোলা হলুদ আর আদা বাছাই করছেন। হৈমী সবার সঙ্গে মিশে কাজ করছে। আজ আর কেউ তাকে শুধু জরামণির বড় মেয়ে বলে চেনে না। সবাই তাকে চেনে—

অরণ্যপত্রের হৈমী নামে।

একটু দূরে বারান্দায় বসে জরামণি সবকিছু দেখছিলেন। বয়স তাঁর কাঁধে ভার হয়ে নেমে এসেছে। হাঁটা আগের মতো আর সহজ নয়। তবু নতুন কোনো চারা দেখলে এখনও ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে মাটি ছুঁয়ে দেখেন। মুখে তখন শিশুর মতো তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে।

সুবর্ণা উঠোনে শুকাতে দেওয়া কফি চেরিগুলো আলতো করে উল্টে দিচ্ছিলেন। পাশেই গ্রামের কয়েকজন নারী কফির বীজ বাছাই করছেন। কাজের ফাঁকেই গল্প চলছে। হাসির শব্দ ভেসে যাচ্ছে পাহাড়ের বাতাসে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে কিছু মানুষ এলেন। কেউ কফি বাগান দেখতে। কেউ পাহাড়ি কৃষি সম্পর্কে জানতে। কেউ অরণ্যপত্রের কফির স্বাদ নিতে। কেউ আবার এক-দুই রাত “মেঘের বাড়ি”তে থেকে যাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে। হৈমী ধৈর্য নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলল। কোথাও নিজের সাফল্যের গল্প বলল না। শুধু বলল—

“পাহাড়কে বদলাতে যাইনি। পাহাড় যেমন ছিল, তাকে বুঝে তার সঙ্গেই পথ চলার চেষ্টা করেছি।”

বিকেলের দিকে কাজ কিছুটা কমে এলে সে একা হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো আমগাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। পাঁচ বছর আগে এখানেই দাঁড়িয়ে সে বাবাকে বলেছিল—

“আগে জমিটার ভাষা শিখতে চাই।”

আজও সে বিশ্বাস করে— প্রকৃতিকে জয় করা যায় না। প্রকৃতির সঙ্গে সহযাত্রী হওয়া যায়।

ঠিক তখনই মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এল। হৈমী ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

“কেমন আছ?”

বার্তাটা পড়ে তার ঠোঁটের কোণে শান্ত একটি হাসি ফুটে উঠল। সে কোনো উত্তর লিখল না। মোবাইলটা আলতো করে পকেটে রেখে দিল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল অরণ্যপত্রের ভেতর দিয়ে।

সব মানুষ জীবনে থেকে যায় না। কেউ কেউ শুধু পথ দেখিয়ে চলে যায়। আর সেই পথেই একদিন মানুষ নিজের ঘরে ফিরে আসে।

পাহাড়ি বাতাসে পাকা কফি চেরির মৃদু গন্ধ ভেসে আসছে। দূরে গ্রামের নারীদের হাসির শব্দ। আরও দূরে ঝিরির অবিরাম কলকল ধ্বনি। পাহাড় যেন নীরবে তাকে আপন করে জড়িয়ে রেখেছে। পাহাড় কখনও তাকে ফেরার জন্য তাড়া দেয়নি। শুধু অপেক্ষা করেছে।

মানুষ কখনও কখনও জীবনের অনেকটা পথ ঘুরে বুঝতে শেখে— শিকড় কোনো দিন মানুষকে ডেকে ক্লান্ত হয় না। একদিন না একদিন, মানুষই ফিরে আসে নিজের শিকড়ের কাছে।

— সমাপ্ত —

Leave a comment