যে সিজদা ভেঙে গিয়েছিল

প্রথম পর্ব

এশার নামাজ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।

মসজিদ থেকে মুসল্লিরা যে যার বাড়ির দিকে চলে গেছে। চারপাশে নীরবতা নেমে এসেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আকাশে চাঁদ নেই, তবে তারাগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

মনসুর আলী মসজিদের বারান্দায় বসে আছেন।

এটা তাঁর বহু বছরের অভ্যাস।

নামাজ শেষে সবাই চলে গেলে তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। কখনো তসবিহ পড়েন, কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই সময়টুকু তিনি নিজের জন্য রাখেন।

কিন্তু আজ তাঁর হাতে তসবিহ থাকলেও আঙুল চলছে না।

মনের মধ্যে শুধু একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে।

জামিলা।

তাঁর একমাত্র মেয়ে।

বারো বছরের মেয়ে।

তিনদিন ধরে জ্বরে পড়ে আছে।

প্রথম দিন সবাই ভেবেছিল সাধারণ জ্বর। দ্বিতীয় দিন গ্রামের ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ বিকেলে ডাক্তার আবার এসে জামিলার কপালে হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন,

—মনসুর ভাই, আর দেরি করা ঠিক হবে না।

—শহরে নিতে হবে।

“শহরে নিতে হবে”—কথাটা শোনার পর থেকেই মনসুর আলীর বুকের ভিতরে একটা পাথর চেপে বসে আছে।

কারণ তিনি জানেন, শহরে যেতে টাকা লাগে।

ডাক্তার লাগে।

ওষুধ লাগে।

আর তাঁর ঘরে টাকা নেই।

তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটলেন।

রাতের গ্রামের পথগুলো অন্যরকম লাগে। দিনের পরিচিত পথও রাতে কেমন অচেনা হয়ে যায়।

উঠানে ঢুকতেই তিনি বুঝতে পারলেন, রাবেয়া এখনো জেগে আছে।

ঘরে ঢুকেই দেখলেন, রাবেয়া জামিলার মাথায় ভেজা কাপড় দিচ্ছে।

কুপির হলুদ আলোয় মেয়েটার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

জামিলা সাধারণত এক মুহূর্তও চুপ করে বসে থাকতে পারে না। কখনো বই নিয়ে বসে, কখনো মায়ের কাজে সাহায্য করে, কখনো বাবার কাছে গল্প শোনার বায়না ধরে।

আজ সে নিশ্চুপ।

চোখ দুটো আধখোলা।

ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।

মনসুর আলী পাশে বসতেই জামিলা কষ্ট করে চোখ খুললো।

মৃদু স্বরে বললো,

—আব্বা…

একটা মাত্র শব্দ।

কিন্তু মনসুর আলীর বুক কেঁপে উঠলো।

তিনি মেয়ের কপালে হাত রাখলেন।

জ্বর আরও বেড়েছে।

রাবেয়া নিচু গলায় বললো,

—কিছু একটা করেন।

মনসুর আলী চুপ করে রইলেন।

কিছুক্ষণ পরে বললেন,

—আল্লাহ ভরসা।

রাবেয়া কোনো উত্তর দিল না।

অনেক সময় মানুষ এত বেশি দুশ্চিন্তায় থাকে যে “আল্লাহ ভরসা” কথাটাও তাকে শান্ত করতে পারে না।

সেদিন রাতে মনসুর আলীর ঘুম আসেনি।

ঘরের এক কোণে বসে বসে তিনি জামিলার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

আর মনে মনে ফিরে যাচ্ছিলেন বারো বছর আগের সেই দিনে।


সেদিনও এমনই এক উদ্বেগের দিন ছিল।

রাবেয়ার প্রসব বেদনা উঠেছিল।

একদিন কেটে গেছে।

আরেকদিনও প্রায় শেষ।

কিন্তু সন্তান জন্ম নিচ্ছে না।

গ্রামের ধাত্রী বারবার মাথা নাড়ছিল।

শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল।

হাসপাতালে পৌঁছে ডাক্তার দেখে বলেছিলেন,

—এখনই অপারেশন লাগবে।

মনসুর আলী তখন যেন আকাশ থেকে পড়েছিলেন।

টাকার অঙ্ক শুনে তাঁর মাথা ঘুরে গিয়েছিল।

এত টাকা তিনি জীবনে কখনো একসাথে দেখেননি।

হাসপাতালের বারান্দা থেকে তিনি গ্রামের এক আত্মীয়ের কাছে খবর পাঠালেন।

যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করতে হবে।

পরদিন সকালে তাঁর দুই বিঘা ফসলি জমি বিক্রি হয়ে গেল।

বাজারদরে না।

তার অর্ধেকেরও কম দামে।

কারণ সবাই জানতো তিনি বিপদে আছেন।

ক্রেতা জমির দাম ঠিক করেনি।

মনসুর আলীর অসহায়ত্ব দাম ঠিক করেছিল।

জমি গেল।

গরু গেল।

রাবেয়ার গলার সোনার চেইন গেল।

যা ছিল, সব গেল।

তবুও তিনি মনে মনে একটাই কথা বলছিলেন,

“টাকা আবার আসবে।”

“কিন্তু মানুষ?”

অপারেশন থিয়েটারের বাইরে বসে তিনি দুই হাত তুলে কাঁদছিলেন।

জীবনে খুব কম মানুষ তাঁকে কাঁদতে দেখেছে।

সেদিন তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন।

—আল্লাহ…

—একজনরে না।

—দুইজনকেই বাঁচাইয়া দাও।

—মা-সন্তান দুইজনকেই ফিরায়া দাও।

—আমি খালি হাতে ফিরতে চাই না আল্লাহ।

অনেকক্ষণ পরে একজন ডাক্তার বের হয়ে এলেন।

মুখে ক্লান্তি।

কিন্তু চোখে আশ্বাস।

—দুইজনই বেঁচে গেছে।

সেই মুহূর্তে মনসুর আলীর মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ বোধহয় তিনি।

কারণ তাঁর রাবেয়া বেঁচে আছে।

তাঁর সন্তান বেঁচে আছে।

কিন্তু আনন্দের মধ্যেও আরেকটা খবর ছিল।

ডাক্তার ধীরে বলেছিলেন,

—মায়ের জীবন বাঁচাতে জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে।

—আর কখনো সন্তান হবে না।

কয়েক সেকেন্ড মনসুর আলী চুপ করে ছিলেন।

তারপর বলেছিলেন,

—ডাক্তার সাহেব, আল্লাহ যদি একটা সন্তানও দেয়, সেইটাও অনেক।

—আমার রাবেয়া বাঁচছে।

—আমার সন্তান বাঁচছে।

—আমার আর কিছু লাগবে না।

সেই সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল জামিলা।

আর সত্যিই, এরপর আর কোনো সন্তান হয়নি।

জামিলাই ছিল তাদের সব।


জামিলা হাঁটতে শেখার পর থেকেই ঘরে আর শান্তি ছিল না।

কখনো উঠানে।

কখনো পুকুরপাড়ে।

কখনো মুরগির পিছনে।

কখনো বাবার পাঞ্জাবি ধরে টানাটানি।

সারাদিন শুধু কথা আর কথা।

রাবেয়া মাঝে মাঝে হেসে বলতো,

—এই মাইয়াডা একদিনে যত কথা কয়, আমি এক মাসে তত কই না।

রাতে ঘুমানোর আগে জামিলার একটা অভ্যাস ছিল।

বাবার কাছে গল্প শুনবে।

গল্প না শুনে তার ঘুম আসতো না।

মনসুর আলী অনেক সময় একই গল্প দশবার বলতেন।

জামিলা তবুও শুনতো।

কারণ গল্পের চেয়ে বাবার কণ্ঠটাই তার বেশি ভালো লাগতো।


আজ সেই মেয়েটাই বিছানায় পড়ে আছে।

তৃতীয় দিনের জ্বর।

পরদিন সকালেও অবস্থার উন্নতি হলো না।

ডাক্তার এসে একই কথা বললেন।

—আজই শহরে নেওন লাগবো।

মনসুর আলী বের হলেন টাকা জোগাড় করতে।

এক বাড়ি।

দুই বাড়ি।

তিন বাড়ি।

সবাই সহানুভূতি দেখালো।

কিন্তু সাহায্য করার সামর্থ্য সবার ছিল না।

একজন বললো,

—গরুটা বেইচা দেন।

মনসুর আলী মাথা নিচু করে রইলেন।

গরুটাই এখন শেষ সম্বল।

তবুও তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন।

কাল সকালে গরু বিক্রি করবেন।

যেভাবেই হোক মেয়েকে শহরে নিয়ে যাবেন।


সন্ধ্যা নেমে এলো।

মাগরিব গেল।

এশাও চলে গেল।

রাত গভীর হতে শুরু করলো।

আশ্চর্যের বিষয়, জামিলার জ্বর যেন কিছুটা কমে গেছে।

রাবেয়ার চোখে একটু আশা দেখা দিল।

—মনে হয় ভালো হইতেছে।

মনসুর আলীও কিছুক্ষণ তাই ভেবেছিলেন।

কিন্তু অনেক সময় ঝড় আসার আগে প্রকৃতি অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যায়।

রাত আরও গভীর হলো।

হঠাৎ ঘরের ভিতর থেকে রাবেয়ার আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এলো।

—জামিলার আব্বা!

—জামিলার আব্বা, তাড়াতাড়ি আসেন!

চিৎকারটা এমন ছিল যে মনসুর আলীর বুক কেঁপে উঠলো।

তিনি দৌড়ে ঘরে ঢুকলেন।

জামিলা শুয়ে আছে।

চোখ বন্ধ।

মুখে অদ্ভুত শান্তি।

যেন গভীর ঘুমে আছে।

তিনি কাছে গিয়ে ডাকলেন,

—মা…

কোনো সাড়া নেই।

আরেকবার ডাকলেন।

—জামিলা…

কিছুই না।

রাবেয়া মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

বারবার ডাকছে।

—মা, একবার চোখ খোল।

—একবার আমার দিকে তাকাও।

কিন্তু কোনো উত্তর নেই।

মনসুর আলী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তাঁর মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেছে।

বারো বছর আগে রাবেয়াকে বাঁচাতে, অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে, দুই বিঘা ফসলি জমি প্রায় পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন তিনি।

সেদিন তিনি নিঃস্ব হয়েছিলেন।

কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছিলেন জামিলাকে।

আজ মনে হচ্ছে, সেই আলোটুকুও নিভে গেল।

ঘরের ভিতর কান্নার শব্দ।

বাইরে গভীর রাত।

আর মনসুর আলীর মনে হচ্ছিল—

তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত শুরু হয়েছে।

(চলবে…)

Leave a comment