তৃতীয় পর্ব
নদীর পাড় থেকে আনা মেয়েটা তিনদিন জ্বরে অচেতন ছিল।
প্রথম দিন সে চোখই খোলেনি।
দ্বিতীয় দিন মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে উঠেছিল।
কখনো হাত নাড়ছিল।
কখনো অস্পষ্ট কিছু বলছিল।
কিন্তু কোনো কথাই বোঝা যাচ্ছিল না।
তৃতীয় দিনের ভোরে প্রথমবারের মতো সে কিছুক্ষণ চোখ খুলে চারদিকে তাকিয়েছিল।
তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল।
এই তিনদিনে মনসুর আলী কিংবা রাবেয়া কেউই তাকে বেশি প্রশ্ন করেনি।
তারা জানতে চেয়েছিল মেয়েটা কোথা থেকে এসেছে, কার মেয়ে, কীভাবে নদীতে পড়লো।
কিন্তু যখনই কিছু জিজ্ঞেস করা হতো, মেয়েটা ফাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকতো।
মনে হতো, প্রশ্নগুলো সে শুনছে।
কিন্তু উত্তরগুলো যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত তারা প্রশ্ন করা কমিয়ে দিল।
কারণ মেয়েটার পরিচয়ের চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন তখন তাদের সামনে ছিল।
সে বাঁচবে তো?
চতুর্থ দিনের সকালে মেয়েটা কিছুটা সুস্থ হলো।
রাবেয়া পাতলা ভাত মেখে তার সামনে বসলো।
মেয়েটা ধীরে ধীরে খাচ্ছিল।
হঠাৎ থেমে গেল।
তারপর চারদিকে তাকাতে লাগলো।
অচেনা ঘর।
অচেনা মানুষ।
অচেনা জীবন।
একসময় খুব আস্তে বললো,
—আম্মা…
রাবেয়ার হাত থেমে গেল।
মেয়েটা আবার বললো,
—আম্মা কই?
রাবেয়া কিছু বললো না।
শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
কপালে ভেজা কাপড় দিতে দিতে হঠাৎ তার হাত থেমে গেল।
মুহূর্তের মধ্যেই হাত সরিয়ে নিল।
যেন নিজের অজান্তে কোথাও ভুল করে ফেলেছে।
তারপর উঠে গিয়ে কলস থেকে নতুন করে পানি আনতে লাগলো।
যদিও পানি বদলানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।
দিনগুলো খুব ধীরে ধীরে কাটছিল।
মনসুর আলীর কাছে সময় যেন আগের মতো আর চলছিল না।
সকালের পর দুপুর।
দুপুরের পর বিকেল।
তারপর রাত।
কিন্তু প্রতিটা দিনের ভেতরেই জামিলা ছিল।
উঠানের প্রতিটা কোণে।
ঘরের প্রতিটা জিনিসে।
আজানের প্রতিটা ধ্বনিতে।
একদিন দুপুরে রাবেয়া জামিলার খাট গুছাচ্ছিল।
এখনও প্রতিদিন একবার সে খাটটা ঝাড়ে।
চাদরটা ঠিক করে।
বালিশটা ঝেড়ে দেয়।
যেন কোনোদিন হঠাৎ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জামিলা বলবে,
—আম্মা, ভাত দাও।
খাটের বালিশের নিচে হাত দিতেই একটা কাগজ বেরিয়ে এলো।
অনেকদিন ধরেই হয়তো ওখানে ছিল।
রাবেয়া ধীরে ধীরে কাগজটা খুললো।
জামিলার হাতের লেখা।
বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“আম্মা, আমি প্রথম হইলে আমারে লাল ব্যাগ কিনা দিবা।”
কাগজটা হাতে নিয়েই রাবেয়া স্থির হয়ে বসে রইলো।
চোখ থেকে শব্দহীনভাবে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
সেদিন দুপুরে আর রান্না হয়নি।
চুলায় আগুনও জ্বলেনি।
বিকেলের দিকে মনসুর আলী ঘরে ঢুকে দেখলেন, রাবেয়া এখনও খাটের পাশে বসে আছে।
খাতার পাতার উপর শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ।
আর তার পাশে নিঃশব্দে বসে আছে শূন্যতা।
মেয়েটা ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছিল।
তবুও তার চোখে ভয় ছিল।
কেউ হঠাৎ ডাকলে চমকে উঠতো।
রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠতো।
কখনো বলতো,
—যামু না…
কখনো বলতো,
—আম্মা…
কখনো শুধু কাঁদতো।
এক রাতে তার কান্নার শব্দে রাবেয়ার ঘুম ভেঙে গেল।
সে উঠে গিয়ে দেখলো, মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই কাঁপছে।
মনে হয় কোনো ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছে।
রাবেয়া আস্তে করে তার মাথায় হাত রাখলো।
কিছুক্ষণ পরে মেয়েটা শান্ত হয়ে গেল।
কিন্তু রাবেয়ার আর ঘুম এলো না।
অন্ধকার ঘরে বসে বসে সে ভাবছিল—
কোথাও কি একটা মা আছে?
যে এখনো তার মেয়েকে খুঁজছে?
যে হয়তো নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে?
যে হয়তো আল্লাহর কাছে কাঁদছে?
এই ভাবনাটা তাকে অদ্ভুতভাবে অস্থির করে তুললো।
দিন কয়েক পরে এক রাতে প্রবল বৃষ্টি নামলো।
মেয়েটাকে যে ছোট ঘরটায় রাখা হয়েছিল, সেখানকার চালের এক কোণা দিয়ে পানি পড়তে শুরু করলো।
রাবেয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর ধীরে বললো,
—ওরে অন্য ঘরে নিতে হইবো।
মনসুর আলী বুঝতে পারলেন, কোন ঘরের কথা বলা হচ্ছে।
দুজনেই চুপ।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
ভেতরে নীরবতা।
কিছুক্ষণ পরে রাবেয়া নিজেই মাথা নাড়লো।
—না…
থাক।
ওখানেই থাক।
কথাটা বলার সময় তার গলা কেঁপে উঠেছিল।
কারণ জামিলার খাটে এখনও অন্য কাউকে শোয়ানোর সাহস তার হয়নি।
মনসুর আলী এখনও মসজিদে যান না।
আজান হলে তিনি চুপচাপ বসে থাকেন।
আজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন।
কারণ আজানের শব্দে তাঁর মনে নামাজের কথা যতটা আসে, তার চেয়েও বেশি মনে পড়ে জামিলার কথা।
তবুও একটা পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটছিল।
তিনি সেটা নিজেও বুঝতে পারছিলেন না।
আগে আজানের শব্দ তাঁর ভিতরে শুধু অভিমান জাগাতো।
এখন মাঝে মাঝে প্রশ্নও জাগে।
কেন?
কিসের জন্য?
কোন উদ্দেশ্যে?
পরদিন ভোরে তিনি নদীর ধারে গেলেন।
সকালবেলার কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
নদী আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে।
যেদিন জামিলা জন্মেছিল, সেদিনও নদী বয়ে যাচ্ছিল।
যেদিন জামিলা চলে গেল, সেদিনও।
যেদিন এই অচেনা মেয়েটাকে তিনি কচুরিপানার ভেতর থেকে তুলে এনেছিলেন, সেদিনও।
নদীর কোনো শোক নেই।
কোনো আনন্দ নেই।
শুধু চলা।
হঠাৎ তাঁর মনে পড়লো, রাতে ঘুমের মধ্যে মেয়েটা কাঁদছিল।
বারবার বলছিল—
—আম্মা, যাইয়ো না…
মনসুর আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপর বহুদিন পরে প্রথমবারের মতো মনে প্রশ্ন জাগলো—
এই মেয়েটাকে কেন তাঁর জীবনে পাঠানো হলো?
উত্তর তিনি জানেন না।
তবে এই প্রথম প্রশ্নটার সঙ্গে অভিমান ছিল না।
ছিল শুধু বিস্ময়।
(চলবে…)


Leave a comment