যে সিজদা ভেঙে গিয়েছিল

দ্বিতীয় পর্ব

রাত ফুরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।

কিন্তু মনসুর আলীর কাছে মনে হচ্ছিল, রাতটা এখনো শেষ হয়নি।

ঘরের এক কোণে সাদা কাফনে মোড়ানো জামিলা শুয়ে আছে।

রাত গভীর হওয়ার আগেই গ্রামের কয়েকজন মানুষ এসে পৌঁছেছিল।

গোসলের কাজ শেষ হয়েছে।

কাফনও পরানো হয়েছে।

ফজরের নামাজের পর জানাজা হবে—এই অপেক্ষায় সবাই আছে।

কুপির আলোয় সাদা কাফনটা আরও সাদা দেখাচ্ছিল।

মনসুর আলী দরজার পাশে বসে ছিলেন।

চোখে আর পানি ছিল না।

সারারাতের কান্নার কারণে নয়।

বরং এমন এক শোক, যেখানে কান্নাও পথ খুঁজে পায় না।

রাবেয়া কাফনের পাশে বসে ছিল।

মাঝে মাঝে কাপড়ের উপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।

যেন জামিলা ঘুমিয়ে আছে।

যেন একটু পরেই উঠে বলবে—

—আম্মা, পানি দাও।

কিন্তু কোনো শব্দ নেই।

কোনো সাড়া নেই।

শুধু নিঃশব্দ অপেক্ষা।

ফজরের আজান হলো।

মনসুর আলীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

এই আজান শুনেই তো জামিলা প্রায়ই বলতো,

—আব্বা, মসজিদে যাইবা না?

আজ সে কিছু বলছে না।

ফজরের নামাজের পর জানাজা হলো।

গ্রামের প্রায় সবাই এসেছিল।

মনসুর আলীর মনে হচ্ছিল, সবকিছু খুব দ্রুত ঘটছে।

অথচ তাঁর মন চাইছিল সময়টা একটু থেমে যাক।

কবরস্থানে মাটি পড়ছিল।

দোয়া হচ্ছিল।

মানুষজন কাঁদছিল।

কিন্তু মনসুর আলীর কাছে সবকিছু কেমন দূরের শব্দ মনে হচ্ছিল।

যেন তিনি সেখানে আছেনও না।


কবর থেকে সবাই ফিরে আসার পর বাড়িটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

সকালের ভিড় কমতে কমতে একসময় শুধু নীরবতা রয়ে গেল।

রাবেয়া দরজার পাশে বসে ছিল।

তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।

সে বারবার উঠানের ফটকের দিকে তাকাচ্ছিল।

যেন অপেক্ষা করছে।

যেন কেউ এসে বলবে—

“ভুল হইছে।”

“জামিলা বাঁচছে।”

কিন্তু এমন কেউ এলো না।

অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে জামিলার খাটের পাশে গিয়ে বসলো।

খাটের নিচে রাখা স্কুলব্যাগটা বের করলো।

ব্যাগের ভিতর থেকে একটা পুরোনো খাতা পেল।

খাতার প্রথম পাতায় জামিলার হাতের লেখা।

বড় বড় অক্ষরে লেখা—

“জামিলা খাতুন”

লেখাটা দেখে রাবেয়ার বুকটা কেঁপে উঠলো।

তারপর সে খাতার ভাঁজে রাখা নীল রঙের একটা চুলের ফিতা বের করলো।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো।

তারপর বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললো,

—এখন এই ফিতাডা কার চুলে বাঁধুম মা?

ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মনসুর আলী কথাটা শুনে মাথা নিচু করলেন।

ধীরে ধীরে উঠানের এক কোণে গিয়ে বসে পড়লেন।

অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।

কারণ তিনি জানতেন, এই মুহূর্তে রাবেয়ার পাশে গিয়ে কোনো সান্ত্বনার কথা বলা যাবে না।

এমন কিছু দুঃখ আছে, যেখানে শব্দের কোনো কাজ হয় না।


দিন যেতে লাগলো।

একদিন।

দুইদিন।

এক সপ্তাহ।

দুই সপ্তাহ।

তারপর প্রায় এক মাস।

ঘরের সবকিছু আগের মতোই আছে।

জামিলার বই।

জামিলার স্কুলব্যাগ।

তার হাতের লেখার খাতা।

তার প্রিয় নীল ফিতা।

কেউ কিছু সরায়নি।

রাবেয়া মাঝেমধ্যে ব্যাগটা খুলে বসে থাকে।

খাতার পাতায় হাত বুলিয়ে দেয়।

যেন মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে এসে আবার পড়তে বসবে।


মসজিদের পাশ দিয়ে প্রতিদিনই মনসুর আলী যায়।

কিন্তু ভেতরে ঢোকে না।

আজান শুনেও ওঠে না।

জায়নামাজ ভাঁজ করা অবস্থায় পড়ে থাকে।

রাতে একা বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আর বুকের ভিতর একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে।

—ক্যান?

—বারো বছর আগে তো ফিরাইছিলা।

—আমি তো দুইজনকেই চাইছিলাম।

—তুমি দিছিলা।

—তাহলে এইবার ক্যান নিলা?

তারপর আরও নিচু গলায় বলে,

—জমি নিলা।

—গরু নিলা।

—সব নিলা।

—আমি কিছু কই নাই।

—কিন্তু মাইয়াডারে ক্যান নিলা?

কথাগুলো বলেই তিনি চুপ হয়ে যান।

কারণ তাঁর ভিতরের আরেকটা মানুষ বলে—

“এই কথা বলা ঠিক না।”

কিন্তু কষ্ট মানুষকে অনেক সময় নিজের সাথেই যুদ্ধ করায়।


প্রায় এক মাস পরে এক বিকেলে মনসুর আলী নদীর ধারে গেলেন।

এই জায়গাটায় তিনি ছোটবেলা থেকে আসেন।

এখানে বসলে মানুষজন কম আসে।

কেউ সান্ত্বনা দেয় না।

কেউ ধৈর্যের কথা বলে না।

নদী শুধু বয়ে যায়।

সেদিন আকাশে কালো মেঘ ছিল।

নদীর পানি ফুলে উঠেছে।

মনসুর আলী চুপচাপ বসে ছিলেন।

হঠাৎ কানে একটা শব্দ এলো।

খুব ক্ষীণ।

প্রথমে মনে হলো কোনো পাখি।

তারপর আবার।

মনে হলো কেউ গোঙাচ্ছে।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

শব্দের দিকে এগোলেন।

কচুরিপানা আর ঝোপের মাঝখানে কিছু একটা আটকে আছে।

আরও কাছে গিয়ে তাঁর বুক কেঁপে উঠলো।

সাত-আট বছরের একটা ছোট মেয়ে।

ভেজা কাপড়।

মুখে কাদা।

চোখ বন্ধ।

এক হাত ঝোপে আটকে আছে।

মেয়েটা খুব আস্তে গোঙাচ্ছিল।

—আম্মা…

—আম্মা…

মনসুর আলী দ্রুত ঝোপ সরিয়ে মেয়েটাকে তুলে নিলেন।

শরীর জ্বরে পুড়ছে।

গলায় কালো সুতোয় বাঁধা ছোট্ট একটা রূপার তাবিজ।

কাদায় মাখা থাকায় তাবিজের লেখাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।

ডান হাতে লাল কাঁচের ভাঙা চুড়ির টুকরো এখনো ঝুলে আছে।

মেয়েটা কোথা থেকে এলো?

কীভাবে এলো?

কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।


বাড়িতে পৌঁছাতেই রাবেয়া ছুটে এলো।

মেয়েটাকে দেখে সে থমকে গেল।

—এইডা কে?

—জানি না।

—নদীর পাড়ে পাইছি।

রাবেয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।

মানুষের বিপদে আগে পরিচয় জিজ্ঞেস করা যায় না।

প্রথমে মানুষকে বাঁচাতে হয়।

সে মেয়েটাকে শুকনো কাপড় পরিয়ে দিল।

কপালে পানি দিল।

শুইয়ে দিল।

অনেকদিন পরে তার হাত আবার একটা শিশুর মাথায় বুলিয়ে গেল।

হঠাৎ হাতটা কেঁপে উঠলো।

কিন্তু সে কিছু বললো না।

শুধু মাথা নিচু করে বসে রইলো।

কারণ কিছু স্মৃতি মানুষকে শব্দহীন করে দেয়।

(চলবে…)

Leave a comment