কুরআন বুঝতে কি সত্যিই আমাদের মধ্যস্থতাকারী দরকার?

একদিন একজন মানুষ আমাকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন।

প্রশ্নটি খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু উত্তর খুঁজতে গেলে বিষয়টি মোটেও সহজ নয়।

তিনি বললেন,

“আমি কুরআন পড়তে পারি। আরবি পড়তে পারি, কিন্তু আরবি আমার মাতৃভাষা নয়। তাই আমি বাংলা অনুবাদ পড়ি। কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি। অনেক বিষয় বুঝতেও পেরেছি। কিন্তু যখন সেই শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে যাই, তখন অনেকে বলে— ‘নিজে নিজে কুরআন বুঝতে যেও না। আলেমদের কাছে যেতে হবে।’”

তারপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

“তাহলে কুরআনটা আসলে কার জন্য নাজিল হয়েছে?”

প্রশ্নটি শুনে আমিও কিছুক্ষণ ভেবেছিলাম।

কারণ এটি শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের প্রশ্ন নয়। এটি মানুষ, জ্ঞান, দায়িত্ববোধ এবং সত্য অনুসন্ধানের প্রশ্ন।

আমাদের সমাজে একটি ধারণা বেশ প্রচলিত— কুরআন সবাই পড়তে পারে, কিন্তু সবাই বুঝতে পারে না।

অন্যদিকে কুরআন খুললেই আমরা দেখি, সেখানে মানুষকে বারবার চিন্তা করতে বলা হচ্ছে, অনুধাবন করতে বলা হচ্ছে, শিক্ষা গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে। মানুষকে তার বুদ্ধি, বিবেক এবং পর্যবেক্ষণশক্তি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

এখানেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জন্ম নেয়।

যদি কুরআন মানুষকে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়, তাহলে একজন সাধারণ মানুষ কি নিজে কুরআন পড়ে তার শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করতে পারবে না?

আবার যদি কুরআন বোঝার জন্য সবসময় অন্য কারও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতেই হয়, তাহলে চিন্তা ও অনুধাবনের এই আহ্বানের অর্থ কী?

সম্ভবত এখানেই আমরা একটি ভুল দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই।

আমরা অনেক সময় ধরে নিই, হয় মানুষ নিজে বুঝবে, নয়তো অন্যের ব্যাখ্যার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবে। যেন মাঝামাঝি কোনো পথ নেই।

কিন্তু বাস্তব জীবন কি কখনো এত সাদা-কালো?

ধরুন, আপনি একটি নতুন শহরে ভ্রমণে গেলেন।

আপনার হাতে একটি মানচিত্র আছে। আপনি নিজে রাস্তা দেখছেন, দিকনির্দেশনা পড়ছেন এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

পথে একজন স্থানীয় মানুষ আপনাকে কিছু পরামর্শ দিলেন। আরেকজন ভিন্ন পরামর্শ দিলেন। তৃতীয় একজন হয়তো আরও একটি পথ দেখালেন।

এখন প্রশ্ন হলো— আপনি কি নিজের চোখ বন্ধ করে প্রথম মানুষের কথা মেনে নেবেন?

নাকি সবার কথা শুনে, মানচিত্র দেখে, নিজের অবস্থান বুঝে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন?

জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই অনুসরণ করি।

ধর্মীয় জ্ঞানও হয়তো এর ব্যতিক্রম নয়।

একজন সাধারণ মানুষ কুরআনের অনুবাদ পড়ে সহজেই বুঝতে পারেন যে মিথ্যা বলা অন্যায়, প্রতারণা অন্যায়, অন্যের অধিকার নষ্ট করা অন্যায়, ন্যায়বিচার করা উত্তম, দান-সদকা প্রশংসনীয়, অহংকার ক্ষতিকর এবং মানুষের প্রতিটি কাজের জবাবদিহি রয়েছে।

এসব বিষয় বুঝতে বিশেষ কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না।

কারণ এগুলো কুরআনের মৌলিক নৈতিক শিক্ষা, যা সরাসরি মানুষের হৃদয় ও বিবেকের সঙ্গে কথা বলে।

কিন্তু এমন কিছু আয়াতও আছে, যেগুলো নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে।

কোনো ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী ছিল?

কোনো শব্দের একাধিক অর্থ থাকলে এখানে কোনটি বেশি উপযুক্ত?

কোনো বিষয়ে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ব্যাখ্যা কেন তৈরি হয়েছে?

এসব ক্ষেত্রে গবেষণা, ভাষাজ্ঞান, ইতিহাস বা তাফসির আমাদের নতুন তথ্য দিতে পারে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

তথ্য পাওয়া আর সিদ্ধান্ত নেওয়া এক জিনিস নয়।

তাফসির আমাদের তথ্য দিতে পারে।

গবেষক আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারেন।

আলেম আমাদের কোনো বিষয়ে সতর্ক করতে পারেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝে নেওয়ার কাজটি আমাদেরই করতে হয়।

কারণ পৃথিবীতে এমন কোনো তাফসির নেই, যেটি পড়ে মানুষের চিন্তার প্রয়োজন একেবারে শেষ হয়ে যায়।

বরং অনেক সময় দেখা যায়, একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় একাধিক মতামত পাওয়া যায়।

একজন ব্যাখ্যাকারী একভাবে দেখেছেন।

অন্যজন অন্যভাবে দেখেছেন।

কেউ ভাষাগত দিককে গুরুত্ব দিয়েছেন, কেউ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে, কেউ আবার আইনগত দিককে।

তখন প্রশ্ন জাগে— কোনটি গ্রহণ করব?

এখানেই হয়তো মানুষের নিজের বিচারবোধের ভূমিকা শুরু হয়।

তবে বিচারবোধ বলতে এখানে নিজের ইচ্ছাকে বোঝানো হচ্ছে না।

কারণ নিজের পছন্দ আর সত্য সবসময় এক জিনিস নয়।

প্রকৃত অনুসন্ধান শুরু হয় তখন, যখন মানুষ নিজের পছন্দকেও প্রশ্ন করতে শেখে।

যখন সে শুধু নিজের মতকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য পড়ে না, বরং সত্যকে জানার জন্য পড়ে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে।

যদি সবাই নিজে চিন্তা করে, তাহলে কি অসংখ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হবে না?

হ্যাঁ, হবে।

মানুষের জ্ঞান ভিন্ন, অভিজ্ঞতা ভিন্ন, পরিবেশ ভিন্ন, বোঝার ক্ষমতাও ভিন্ন।

তাই মতভেদ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু মতভেদ থাকা আর চিন্তার স্বাধীনতা না থাকা— এই দুটি বিষয় এক নয়।

পৃথিবীর প্রায় সব জ্ঞানক্ষেত্রেই মতভেদ রয়েছে।

ইতিহাসে আছে।

দর্শনে আছে।

বিজ্ঞানে আছে।

আইনে আছে।

ধর্মীয় আলোচনাতেও আছে।

মতভেদ নিজেই কোনো সমস্যা নয়।

সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে ফেলে।

যখন সে মনে করে, কোনো একটি ব্যাখ্যা নিয়ে আর চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

যখন সে নিজের উপলব্ধির দায়িত্ব পুরোপুরি অন্য কারও হাতে তুলে দেয়।

অথবা উল্টোভাবে, যখন সে মনে করে পৃথিবীর সব মানুষ ভুল আর শুধু সে-ই সঠিক।

দুই অবস্থানই মানুষকে ভারসাম্য থেকে দূরে নিয়ে যায়।

সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর অবস্থান হলো বিনয়ী অনুসন্ধানের অবস্থান।

যেখানে মানুষ নিজে পড়ে।

নিজে চিন্তা করে।

প্রয়োজনে অন্যদের কথা শোনে।

বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেখে।

প্রশ্ন করে।

ভুল হলে সংশোধন করে।

আর সত্যের কাছে পৌঁছানোর জন্য নিজের অহংকারের সঙ্গে লড়াই করে।

হয়তো কুরআনের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও আমাদের এমন একটি পথের প্রয়োজন।

একটি পথ, যেখানে অন্ধ অনুসরণ নেই।

আবার অহংকারী আত্মনির্ভরতাও নেই।

যেখানে জ্ঞানীদের প্রতি সম্মান আছে, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতাও আছে।

যেখানে পরামর্শ আছে, কিন্তু বিবেকের দরজায় তালা নেই।

যেখানে অনুসন্ধান আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই।

সবশেষে হয়তো প্রকৃত প্রশ্নটি “আলেমের প্রয়োজন আছে কি নেই”— সেটি নয়।

প্রকৃত প্রশ্নটি হলো—

আমি কি সত্যকে জানার জন্য পড়ছি, নাকি শুধু আমার পূর্বধারণাকে সমর্থন করার জন্য পড়ছি?

আমি কি অন্যের চিন্তাকে সম্মান করছি, নাকি অন্ধভাবে অনুসরণ করছি?

আমি কি প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছি?

আমি কি নিজের উপলব্ধিকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করছি?

আমি কি সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত, এমনকি যদি সেটি আমার দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো কোনো তাফসির, কোনো বক্তা বা কোনো বই আমাদের হয়ে দিতে পারবে না।

একদিন প্রত্যেক মানুষকেই নিজের কাছে এই উত্তর দিতে হবে।

আর হয়তো সেখান থেকেই সত্যিকারের বোঝাপড়ার যাত্রা শুরু হয়।

Leave a comment