আমরা কি সত্যিই শুনি, নাকি শুধু উত্তর দেওয়ার অপেক্ষা করি?

একদিন একজন পরিচিত মানুষ আমার কাছে একটি প্রশ্ন নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কথা শুরু করলেন, আর আমি মনে মনে উত্তর সাজাতে শুরু করলাম। তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি উত্তর দিয়ে ফেললাম।

তিনি একটু থেমে বললেন, “আপনি যা বুঝেছেন, আমি আসলে তা বোঝাতে চাইনি।”

আমি বিব্রত হলাম।

তিনি আবার শুরু করলেন। আমি মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু কিছুদূর যেতেই আবার মনে হলো, বুঝে ফেলেছি তিনি কী বলতে চাইছেন। এবারও আমি মাঝপথে উত্তর দিলাম।

তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু কথার প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন।

পরে বুঝলাম, তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন।

আরও পরে বুঝলাম, আমি তাঁর কথা শুনিনি। আমি শুধু তাঁর কথার শুরুটা শুনেছিলাম।

এই অভিজ্ঞতা আমার জন্য নতুন নয়। বরং জীবনের নানা সময়ে খেয়াল করেছি, অনেক কথোপকথনে আমি উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকি, কিন্তু শোনার জন্য প্রস্তুত থাকি না। প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগেই মনে হয়, আমি জানি সামনে কী আসছে। মানুষটি কী বলতে চায়, সেটাও যেন আগে থেকেই বুঝে ফেলেছি। অথচ শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, আমার ধারণা আর তাঁর বক্তব্যের মধ্যে খুব বেশি মিল নেই।

তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই শুনি, নাকি শুধু উত্তর দেওয়ার অপেক্ষা করি?

আমাদের সময়ে কথা বলার সুযোগ অনেক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মন্তব্যের ঘর, আলোচনা অনুষ্ঠান, ভিডিও, পডকাস্ট—সবখানে মানুষ কথা বলছে। কিন্তু যত বেশি কথা বলছি, তত বেশি কি আমরা শুনছি?

বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা শুনি না; আমরা অনুমান করি।

কেউ একটি কথা শুরু করল। আমরা বাকিটা নিজেরাই পূরণ করে ফেলি। কেউ একটি প্রশ্ন করল। আমরা ধরে নিই, এর পরের অংশ কী হবে। কেউ কোনো অভিযোগ করল। আমরা মনে করি, এর উত্তর আমাদের জানা।

ফলে আমরা মানুষটিকে শুনি না; আমরা নিজের ধারণাকে শুনি।

একজন মানুষ কোনো প্রশ্ন শুরু করলেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে অতীতের কোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। মনে হলো, “এ কথা তো আগেও শুনেছি।”

তারপর আর পুরোটা শোনা হলো না।

কিন্তু মানুষ কোনো টেমপ্লেট নয়।

একই বাক্য দিয়ে শুরু হওয়া দুইটি প্রশ্নের গন্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। একই সমস্যার কথা বলা দুইজন মানুষের অভিজ্ঞতা এক নাও হতে পারে। একই বিশ্বাস ধারণ করা দুইজন মানুষের ভাবনার গভীরতা সমান নাও হতে পারে।

কিন্তু আমরা প্রায়ই এই পার্থক্যগুলো দেখার আগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই।

আসলে আমরা অনেক সময় বুঝতে নয়, উত্তর দিতে শুনি।

আর এই একটিমাত্র অভ্যাস অসংখ্য ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়।

এই অভ্যাস পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে, বন্ধুত্বে দূরত্ব সৃষ্টি করে, দাম্পত্য সম্পর্কে অশান্তি ডেকে আনে, এমনকি সমাজে বিভাজনও বাড়ায়।

একজন সন্তান হয়তো বাবার কাছে কোনো কথা বলতে এসেছে। বাবা প্রথম কয়েকটি শব্দ শুনেই উপদেশ শুরু করে দিলেন। একজন স্ত্রী হয়তো তাঁর অনুভূতির কথা বলতে চেয়েছিলেন। স্বামী মাঝপথেই সমাধান দিতে শুরু করলেন। একজন বন্ধু হয়তো শুধু মন খুলে কথা বলতে চেয়েছিল। আমরা তাকে পরামর্শের বন্যায় ভাসিয়ে দিলাম।

আমরা ভাবি, আমরা সাহায্য করছি।

কিন্তু অনেক সময় মানুষ উত্তর খুঁজতে আসে না। সে চায়, কেউ তার কথা মন দিয়ে শুনুক।

শোনা একটি অদ্ভুত ক্ষমতা। কারণ এটি বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হয়। কেউ কথা বলছে, আরেকজন শুনছে—এতে আবার বিশেষ কী আছে?

কিন্তু বাস্তবে মন দিয়ে শোনা খুব কঠিন।

কথা বলার সময় আমরা নিজের ভাবনা প্রকাশ করি। কিন্তু শোনার সময় নিজের ভাবনাকে সাময়িকভাবে থামাতে হয়। নিজের সিদ্ধান্তকে একটু পিছিয়ে রাখতে হয়। নিজের ব্যাখ্যাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাতে হয়।

এই অপেক্ষা আমাদের জন্য সহজ নয়।

আমরা প্রায়ই ভাবি, জ্ঞানী মানুষ মানে যার কাছে অনেক উত্তর আছে। কিন্তু হয়তো জ্ঞানী মানুষের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি জানেন কখন উত্তর না দিয়ে আগে শুনতে হয়।

অনেক সময় একটি ভালো প্রশ্নের চেয়ে মূল্যবান হলো একটি মনোযোগী শ্রোতা।

আমি জীবনে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের কাছে সব প্রশ্নের উত্তর ছিল না। কিন্তু তাঁদের কাছে কথা বলতে ভালো লাগত। কারণ তাঁরা শুনতেন। সত্যিই শুনতেন। কথা শেষ হওয়ার আগে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতেন না। মাঝপথে থামিয়ে দিতেন না। নিজের মতামত চাপিয়ে দিতেন না।

ফলে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় মনে হতো, আমার কথাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

অন্যদিকে এমন অনেক মানুষও দেখেছি, যাঁরা অত্যন্ত মেধাবী, জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বস্তি হয়। কারণ তাঁরা শোনেন না। তাঁরা শুধু উত্তর দেন।

মানুষ সাধারণত ভুল উত্তরকে যতটা অপছন্দ করে, তার চেয়েও বেশি অপছন্দ করে অবহেলিত হওয়ার অনুভূতিকে।

কেউ যখন আমাদের কথা মন দিয়ে শোনে, তখন আমরা শুধু নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পাই না; আমরা সম্মানিতও বোধ করি।

আজকের পৃথিবীতে এই দক্ষতাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সবাই নিজের মত প্রকাশ করতে আগ্রহী, কিন্তু অন্যের মত বোঝার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।

ফলে আলোচনা দ্রুত বিতর্কে পরিণত হয়, আর বিতর্ক দ্রুত সংঘাতে।

একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই আমরা পক্ষ বেছে নিই।

একটি বাক্য শেষ হওয়ার আগেই আমরা রায় দিয়ে দিই।

একটি মানুষের অভিজ্ঞতা শোনার আগেই আমরা তাকে ব্যাখ্যা করে ফেলি।

কিন্তু প্রজ্ঞার পথ সম্ভবত অন্যরকম।

প্রজ্ঞা হয়তো সবসময় দ্রুত উত্তর দেওয়ার মধ্যে নয়। কখনো কখনো প্রজ্ঞা লুকিয়ে থাকে ধৈর্য নিয়ে শোনার মধ্যে।

কেউ যখন কথা বলে, তখন শুধু শব্দ শোনা যথেষ্ট নয়। তার অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, দ্বিধা, প্রশ্ন—সবকিছুর দিকে মন খোলা রাখা দরকার। কারণ অনেক সময় মানুষ যা বলছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কেন বলছে।

পরের বার কেউ আপনার কাছে কোনো প্রশ্ন নিয়ে এলে, একটু থামুন।

উত্তর দেওয়ার তাড়াহুড়ো করবেন না।

প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুনুন।

হয়তো আপনি আবিষ্কার করবেন, আপনি যে প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করেছিলেন, আসল প্রশ্নটি সেটি ছিলই না।

কারণ অনেক ভুল উত্তরের জন্ম জ্ঞানের অভাব থেকে নয়; অসম্পূর্ণভাবে শোনার অভ্যাস থেকে।

আর অনেক সম্পর্ক ভাঙে মতভেদের কারণে নয়; একে অপরকে সত্যিকার অর্থে না শোনার কারণে।

আমরা প্রায়ই মনে করি প্রজ্ঞা মানে অনেক উত্তর জানা। অথচ অনেক সময় প্রজ্ঞা শুরু হয় একটি সাধারণ কাজ দিয়ে—মনোযোগ দিয়ে শোনা।

কারণ মানুষের কথার ভেতরে শুধু শব্দ থাকে না; থাকে অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, সংশয় এবং অদেখা এক জগৎ। সেই জগতে প্রবেশের দরজা উত্তর নয়, শ্রবণ।

হয়তো তাই প্রজ্ঞার শুরু কথা বলা থেকে নয়, মন দিয়ে শোনা থেকে।

Leave a comment