আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো—মানুষ ভিন্ন মতকে ভুল মনে করার আগেই মানুষটিকে ভুল মনে করতে শুরু করেছে।
একসময় রায়হান আর শুভ ছিল অবিচ্ছেদ্য বন্ধু।
স্কুলজীবন থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই মাঠে খেলা, একই বেঞ্চে বসে পড়া, এমনকি ভবিষ্যতের স্বপ্নও অনেকটা একসঙ্গেই দেখা। তাদের বন্ধুত্ব দেখে অনেকে বলত, এরা যেন দুই শরীরের এক প্রাণ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলায়। অভিজ্ঞতা বদলায়। পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর রায়হান একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হলো। শুভ অন্য একটি মতাদর্শে বিশ্বাস করতে শুরু করল। শুরুতে তারা আগের মতোই আলোচনা করত। কখনও কখনও তর্কও হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই তর্ক উত্তপ্ত হতে লাগল।
একদিন একটি সামাজিক ইস্যু নিয়ে তীব্র বিতর্কের সময় শুভ বলেছিল,
— “তুমি ভুল ভাবছো।”
রায়হান উত্তর দিয়েছিল,
— “না, তুমি বাস্তবতা বুঝতে পারছো না।”
সেদিনের পর আরেকটি তর্ক, তারপর আরেকটি। একসময় তারা কথা বলা বন্ধ করে দিল।
কেউ কাউকে গালি দেয়নি। কেউ কারও ক্ষতি করেনি।
তবুও তারা দূরে সরে গেল।
কারণ তারা একটি বড় ভুল করেছিল।
তারা মতভেদকে শত্রুতা ভেবে নিয়েছিল।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষ প্রায়ই ভিন্ন মতকে ভিন্ন মানুষ হিসেবে নয়, বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
কেউ একটি রাজনৈতিক বিষয়ে ভিন্ন মত দিলেই আমরা ভাবি সে ভুল।
কেউ ধর্ম, সংস্কৃতি, শিক্ষা বা সমাজ নিয়ে অন্যরকম চিন্তা করলেই আমরা ধরে নিই সে আমাদের বিপক্ষে।
কিন্তু একটু থেমে ভাবুন।
এই পৃথিবীতে কি কখনও এমন হয়েছে, যেখানে সবাই সব বিষয়ে একমত ছিল?
একই পরিবারের দুই ভাইয়ের মত এক নয়।
একই ক্লাসের দুই ছাত্র একই বই পড়েও ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
একই ঘটনার সাক্ষী থাকা দুই ব্যক্তি একইভাবে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করে না।
কারণ মানুষ কেবল তথ্য দিয়ে চিন্তা করে না।
তার অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক বাস্তবতা, আনন্দ, কষ্ট, সাফল্য, ব্যর্থতা—সবকিছু মিলে তার চিন্তাজগত গড়ে ওঠে।
ফলে মতের ভিন্নতা অস্বাভাবিক নয়।
বরং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে অস্বাভাবিক করে তুলছি?
এর একটি বড় কারণ হলো আমরা অনেক সময় মতামতকে নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলি।
আমার মতই আমি।
আমার বিশ্বাসই আমার পরিচয়।
আমার অবস্থানই আমার অস্তিত্ব।
ফলে কেউ যখন আমার মতের সমালোচনা করে, তখন আমি মনে করি সে আমাকে আক্রমণ করছে।
আসলে সে হয়তো আমার চিন্তার একটি অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কিন্তু আমি সেটিকে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে দেখি।
এখানেই সমস্যার শুরু।
মতের সমালোচনা আর ব্যক্তির সমালোচনা এক বিষয় নয়।
একটি ধারণা ভুল হতে পারে।
একটি যুক্তি দুর্বল হতে পারে।
একটি অবস্থান পরিবর্তনযোগ্য হতে পারে।
কিন্তু তাই বলে সেই মানুষটিও খারাপ হয়ে যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আগে মানুষ মুখোমুখি আলোচনা করত।
চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলত।
হাসি, কণ্ঠস্বর, ভদ্রতা—সবকিছু আলোচনার অংশ ছিল।
এখন অনেক আলোচনা একটি স্ক্রিনের আড়ালে হয়।
কয়েক লাইনের মন্তব্যে আমরা একজন মানুষের পুরো ব্যক্তিত্ব বিচার করে ফেলি।
একটি পোস্ট দেখে তাকে বন্ধু কিংবা শত্রুর তালিকায় ফেলে দিই।
ফলে মতভেদ দ্রুত বিদ্বেষে রূপ নেয়।
আজ আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে অনেক মানুষ ভিন্ন মত শুনতেই চায় না।
তারা কেবল নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে চায়।
যারা তাদের সঙ্গে একমত, তাদের কথা শুনে স্বস্তি পায়।
যারা একমত নয়, তাদের এড়িয়ে চলে।
কিন্তু এতে কি সত্যের কাছে পৌঁছানো যায়?
ইতিহাস অন্য কথা বলে।
মানবসভ্যতার বড় বড় অগ্রগতি এসেছে মতভেদের মধ্য দিয়ে।
বিজ্ঞান এগিয়েছে প্রশ্ন থেকে।
দর্শন এগিয়েছে বিতর্ক থেকে।
গবেষণা এগিয়েছে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস থেকে।
যদি সবাই সবসময় একই কথা মেনে নিত, তাহলে নতুন কিছু আবিষ্কার হতো না।
নতুন চিন্তা জন্ম নিত না।
নতুন পথও খুলত না।
সভ্যতার ইতিহাস আসলে এক অর্থে সম্মানজনক মতভেদের ইতিহাস।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
মতভেদ মানে শত্রুতা নয়।
মতভেদ মানে কেবল একটি বিষয়কে দুইজন মানুষ দুইভাবে দেখছে।
এর বেশি কিছু নয়।
আমি তোমার সঙ্গে একমত নই—এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান।
আমি তোমাকে ঘৃণা করি—এটি একটি আবেগগত সিদ্ধান্ত।
এই দুটিকে আমরা প্রায়ই এক করে ফেলি।
ফলাফল?
বন্ধুত্ব নষ্ট হয়।
পরিবারে দূরত্ব তৈরি হয়।
সমাজ বিভক্ত হয়।
আর আমরা ধীরে ধীরে আলোচনার সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলি।
কিছু মানুষ মনে করেন, মতভেদ থাকলে সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না।
বাস্তবতা ঠিক উল্টো।
পরিণত সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সম্মান বজায় রাখা।
একজন সত্যিকারের বন্ধু সেই নয়, যে সবসময় আপনার সঙ্গে একমত হবে।
বরং সেই, যে ভিন্নমত পোষণ করেও আপনাকে সম্মান করবে।
একজন পরিণত মানুষ সেই নয়, যার কোনো মতভেদ নেই।
বরং সেই, যে মতভেদের মধ্যেও ভদ্রতা ও মানবিকতা ধরে রাখতে পারে।
অনেক বছর পর রায়হান ও শুভর আবার দেখা হলো।
সময়ের সঙ্গে তাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
তারা বসে দীর্ঘক্ষণ কথা বলল।
পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করল।
একসময় তারা বুঝতে পারল, তাদের মত এখনও আলাদা।
কিন্তু সেই পার্থক্য বন্ধুত্ব হারানোর মতো এত বড় বিষয় ছিল না।
তারা দুজনেই উপলব্ধি করল, যে বিষয় নিয়ে তারা একসময় সম্পর্ক নষ্ট করেছিল, সেটি আসলে ছিল মতের অমিল, মানুষের অমিল নয়।
সেদিন বিদায় নেওয়ার সময় তারা আর একে অপরকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেনি।
তারা শুধু একে অপরকে বুঝতে চেষ্টা করেছিল।
আর সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।
একটি সভ্য সমাজের শক্তি এই নয় যে সেখানে সবাই একই কথা বলে।
বরং সেখানে ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন মতামত থাকা সত্ত্বেও সবাই একসঙ্গে বসতে পারে, কথা বলতে পারে এবং পরস্পরকে সম্মান করতে পারে।
যে সমাজে মতভেদকে শত্রুতা মনে করা হয়, সেখানে বিভাজন বাড়ে।
আর যে সমাজে মতভেদকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে প্রজ্ঞা জন্ম নেয়।
আমাদের সবারই মত থাকবে।
মতের পার্থক্যও থাকবে।
সেটি থাকুক।
কিন্তু সেই পার্থক্য যেন মানবিকতাকে হারিয়ে না ফেলে।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় করে তোলে তার মত নয়, তার মন।
আর সত্যিকারের প্রজ্ঞা শুরু হয় তখনই, যখন আমরা বুঝতে শিখি—
পৃথিবীর সব মানুষ কখনও একমত হবে না।
সেটি হওয়ারও দরকার নেই।
দরকার হলো, ভিন্ন পথের যাত্রী হয়েও যেন আমরা একে অপরকে মানুষ হিসেবে দেখতে না ভুলে যাই।
কারণ একটি প্রশ্নের একাধিক উত্তর থাকতে পারে, কিন্তু মানবিকতার বিকল্প কোনো উত্তর নেই।
মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়।


Leave a comment