স্কুলে পড়ার সময় রাহাতের একটি অভ্যাস ছিল। সে প্রায় সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করত।
শিক্ষক কোনো কিছু বোঝালে সে হাত তুলত।
— স্যার, এটা এমন হলো কেন?
— ম্যাডাম, অন্যভাবে কি হতে পারত না?
— এই নিয়মটা কে বানিয়েছে?
প্রথম দিকে শিক্ষকরা বিষয়টিকে কৌতূহল হিসেবে দেখতেন। সহপাঠীরাও মজা পেত। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল।
একদিন বিজ্ঞান ক্লাসে রাহাত একটি প্রশ্ন করেছিল। শিক্ষক কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন,
— এত প্রশ্ন করো কেন? বইয়ে যা আছে, তাই পড়ো।
ক্লাসের কয়েকজন হেসে উঠল।
রাহাত চুপ করে গেল।
সেদিন হয়তো খুব বড় কিছু ঘটেনি। কিন্তু তার ভেতরে ছোট্ট একটি পরিবর্তন শুরু হয়ে গেল। সে বুঝতে শিখল, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আরও বড় কথা, সব জায়গায় প্রশ্ন করাও নিরাপদ নয়।
কয়েক মাস পরে সে আর হাত তুলত না।
প্রশ্নগুলো তখনও তার মাথায় আসত, কিন্তু মুখ পর্যন্ত পৌঁছাত না।
অনেক বছর পেরিয়ে গেল।
রাহাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল, চাকরি পেল। একদিন অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় বসে ছিল। একটি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। রাহাতের মনে হলো, পরিকল্পনাটিতে একটি বড় ঝুঁকি আছে। সে প্রশ্ন করতে চেয়েছিল।
কিন্তু করল না।
মনে হলো, যদি সবাই ভাবে সে অযথা জটিলতা তৈরি করছে?
যদি প্রশ্নটা ভুল হয়?
যদি মানুষ হাসে?
সভা শেষ হয়ে গেল।
কয়েক মাস পরে ঠিক সেই সমস্যাটিই দেখা দিল, যা নিয়ে তার মনে প্রশ্ন এসেছিল।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ তার মনে পড়ল ছোটবেলার সেই শ্রেণিকক্ষের কথা।
হয়তো প্রশ্ন করার অভ্যাসটি সেদিনই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল।
রাহাতের গল্পটি কেবল রাহাতের নয়।
এটি আমাদের অনেকের গল্প।
আমরা সবাই জন্মগতভাবে কৌতূহলী।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর তার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো প্রশ্ন করার ক্ষমতা।
— এটা কী?
— ওটা কেন?
— আকাশ নীল কেন?
— পাখি উড়ে কীভাবে?
একটি শিশুকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সে পৃথিবীকে প্রশ্নের মাধ্যমে চিনতে শেখে।
সে ভয় পায় না।
সে ভাবেও না যে তার প্রশ্নটি বোকামি হতে পারে।
ভয়টা আমরা পরে শিখি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শুরু করি, কিছু প্রশ্ন মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে।
কিছু প্রশ্ন করলে মানুষ বিরক্ত হয়।
কিছু প্রশ্ন করলে আমাদের অবাধ্য, বেয়াদব কিংবা ঝামেলাপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
ধীরে ধীরে আমরা প্রশ্ন করার আগে ভাবতে শিখি।
আর তারপর একসময় প্রশ্ন করাটাই ভুলে যাই।
আমাদের পরিবারে অনেক সময় সন্তানকে বলা হয়,
— বড়দের কথার ওপর কথা বলতে নেই।
এই কথার মধ্যে সম্মানের শিক্ষা আছে।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে অজান্তেই আরেকটি বার্তা যুক্ত হয়ে যায়—
— প্রশ্ন করো না।
ফলে শিশুটি বড় হতে হতে বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রশ্ন করা মানে অসম্মান করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই প্রবণতা দেখা যায়।
আমরা অনেক সময় উত্তর মুখস্থ করার জন্য পুরস্কৃত হই, কিন্তু প্রশ্ন করার জন্য নয়।
পরীক্ষায় সঠিক উত্তর লিখলে নম্বর পাওয়া যায়।
কিন্তু নতুন প্রশ্ন তোলার জন্য খুব কমই পুরস্কার মেলে।
ফলে আমরা তথ্য সংগ্রহ করি, কিন্তু অনুসন্ধানের অভ্যাস হারিয়ে ফেলি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো— ভুল প্রমাণিত হওয়ার ভয়।
আমরা অনেকেই প্রশ্ন করি না, কারণ মনে হয়—
“যদি প্রশ্নটা খুব সাধারণ হয়?”
“যদি সবাই ভাবে আমি কিছুই জানি না?”
“যদি আমার অজ্ঞতা প্রকাশ পেয়ে যায়?”
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা জানি না বলার চেয়ে না জেনে থাকার মধ্যেই বেশি স্বস্তি খুঁজে পাই।
কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান কখনোই সব জানার দাবি করে না।
প্রকৃত জ্ঞান শুরু হয় এই স্বীকারোক্তি দিয়ে—
“আমি জানি না।”
যে মানুষ নিজের অজানাকে স্বীকার করতে পারে, সে-ই নতুন কিছু শেখার সুযোগ পায়।
ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই সত্য দেখতে পাই।
মানবসভ্যতার বড় বড় অগ্রগতির শুরু কোনো উত্তর থেকে হয়নি।
শুরু হয়েছে প্রশ্ন থেকে।
একদিন কেউ প্রশ্ন করেছিল—
পৃথিবী কি সত্যিই মহাবিশ্বের কেন্দ্র?
কেউ প্রশ্ন করেছিল—
মানুষ কি আকাশে উড়তে পারে?
কেউ প্রশ্ন করেছিল—
রোগের কারণ কী?
কেউ প্রশ্ন করেছিল—
সব মানুষ কি সমান মর্যাদার অধিকারী?
আজ আমরা যেসব অর্জনকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, সেগুলোর অধিকাংশই একসময় ছিল সাহসী প্রশ্নের ফল।
প্রশ্ন কেবল তথ্য খোঁজে না।
প্রশ্ন সম্ভাবনা খোঁজে।
প্রশ্ন নতুন পথ খোঁজে।
প্রশ্ন প্রতিষ্ঠিত সত্যকে যাচাই করে।
প্রশ্ন মানুষকে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
তবুও আমরা প্রশ্ন করতে ভয় পাই।
কারণ প্রশ্নের সঙ্গে অনিশ্চয়তা জড়িত।
প্রশ্ন করলে আমরা স্বীকার করি যে আমরা সব জানি না।
আর অনেক সময় মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় অজানা নয়, নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ পাওয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই সমস্যা আরও স্পষ্ট।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ দ্রুত মতামত দেয়, কিন্তু ধীরে প্রশ্ন করে।
একটি খবর দেখেই আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই।
একটি ভিডিও দেখেই মতামত তৈরি করে ফেলি।
একটি পোস্ট পড়েই বিচার করে বসি।
কিন্তু খুব কম মানুষ থেমে জিজ্ঞেস করে—
এটি কি সত্য?
এর অন্য কোনো দিক আছে কি?
আমি কি যথেষ্ট জানি?
ফলে তথ্য বাড়ছে, কিন্তু অনুসন্ধান কমছে।
মতামত বাড়ছে, কিন্তু প্রজ্ঞা নয়।
এটাই হয়তো আমাদের সময়ের অন্যতম বড় সংকট।
প্রশ্নহীন সমাজ বাইরে থেকে শান্ত মনে হতে পারে।
কিন্তু সেই শান্তি অনেক সময় স্থবিরতার শান্তি।
সেখানে মানুষ অনুসরণ করে, কিন্তু অনুসন্ধান করে না।
সেখানে স্লোগান থাকে, কিন্তু সংলাপ থাকে না।
সেখানে মতামত থাকে, কিন্তু কৌতূহল থাকে না।
আর কৌতূহল ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না।
আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রশ্নের গুরুত্ব অপরিসীম।
আমি কি সত্যিই সুখী?
আমি যা করছি, তা কি আমার মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আমি কি অন্যের কথা মন দিয়ে শুনি?
আমি কি ভুল হলে তা স্বীকার করতে পারি?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
কিন্তু এগুলোই মানুষকে পরিণত করে।
যে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে না, সে নিজেকে বদলাতেও পারে না।
প্রশ্ন মানেই বিদ্রোহ নয়।
প্রশ্ন মানেই অবিশ্বাস নয়।
প্রশ্ন মানেই অসম্মান নয়।
বরং অনেক সময় প্রশ্নই সত্যের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।
কারণ প্রশ্ন করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জানার ইচ্ছা।
শেখার ইচ্ছা।
আর উন্নতির সম্ভাবনা।
তাই আমাদের সন্তানদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমন হতে হবে, যেখানে কৌতূহলকে উৎসাহ দেওয়া হয়।
আমাদের সমাজকে এমন হতে হবে, যেখানে ভিন্ন প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয় না।
কারণ প্রশ্নহীন মানুষ হয়তো নিয়ম মেনে চলতে পারে, কিন্তু নতুন পথ খুঁজে পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে যায়।
প্রজ্ঞার শুরু উত্তর থেকে নয়।
প্রজ্ঞার শুরু প্রশ্ন থেকে।
হয়তো আমাদের জীবনের অনেক উত্তর এখনও অজানা।
কিন্তু সেই উত্তরগুলোর দিকে প্রথম পদক্ষেপটি কোনো উত্তর নয়— একটি প্রশ্ন।
তাই নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন—
আমি শেষ কবে সত্যিই কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছি?


Leave a comment